টিনা প্রামাণিক, নয়া জামানা, মালদহ: মানুষের জীবনের সবথেকে বড় অবলম্বন হলো তার পরিবার। আর সেই পরিবারের শিকড় যদি নিমেষের মধ্যে উপড়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মালদহের কালিয়াচকের শিক্ষক এমডি ইয়াসিন আনসারি যে নজির গড়লেন, তা দেখে স্তম্ভিত গোটা রাজ্য। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে চিরতরে হারিয়েছেন প্রাণপ্রিয় স্ত্রী এবং মাত্র নয় মাসের শিশুপুত্রকে। অথচ সেই মর্মান্তিক শোক বুকে পাথরের মতো চেপে রেখেই তিনি হাজিরা দিলেন সরকারি শুনানিতে। স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহ মর্গে শুইয়ে রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া এক পিতার এই লড়াই দেখে চোখে জল মালদহবাসীর।
গাজল থানার খড়দহিল এলাকার বাসিন্দা এমডি ইয়াসিন কালিয়াচকের সুজাপুর নয়মৌজা হাই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। যাতায়াতের সুবিধার জন্য কর্মস্থলের পাশেই একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে থাকতেন স্ত্রী হালিমা খাতুন এবং তাঁদের কোলের সন্তান আরিফ হাসান। জানা গিয়েছে, নথিতে নামের বানান ভুল থাকার কারণে শুক্রবার গাজলে ‘স্কুল সার্ভিস ইনস্পেকশন রিপোর্ট’ বা এসআইআর-এর শুনানিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ ছিল তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর ওপর। সেই জরুরি তলব রক্ষা করতেই বৃহস্পতিবার রাতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। গন্তব্য ছিল বাস ধরা, তাই আমবাজার এলাকায় যাওয়ার জন্য একটি টোটো ভাড়া করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাঝপথে সুস্তানি এলাকায় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় টোটোটি।
ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় স্ত্রী হালিমার। গুরুতর জখম অবস্থায় নয় মাসের শিশু আরিফকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষক ইয়াসিনের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যায়। স্বজন হারানোর আর্তনাদে যখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইয়াসিন এক অকল্পনীয় সিদ্ধান্ত নেন। পরিজনদের খবর দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের দেহ মালদহ মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখার ব্যবস্থা করেন তিনি। এরপর চোখের জল মুছে সরাসরি পৌঁছে যান এসআইআর শুনানিকেন্দ্রে। সেখানে নির্ধারিত কাজ শেষ করে তবেই তিনি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আত্মীয়দের কথায়, ইয়াসিন ফিরলে তবেই ময়নাতদন্তের পর দেহ কবরস্থ করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কর্তব্যের প্রতি এমন চরম দায়বদ্ধতা দেখে শোকের আবহেও বাকরুদ্ধ তাঁর সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা।
আরও পড়ুন:
তেল-তর্কে ট্রাম্পের ট্রামকার্ড, রাশিয়া ইস্যুতে চুপ সাউথ ব্লক