
আহমেদ বাপী,নয়া জামানা,গাজোল: গ্রামের উন্নয়ন মানেই শুধু কাঁচা রাস্তা পাকা করা বা দু-একটি আলো বসানো নয় প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয় যখন প্রশাসনের পরিকল্পনা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন একজন বৃদ্ধ নিয়মিত ভাতা পান একজন কৃষক সময়মতো সহায়তা পান, একজন মা বিনামূল্যে চিকিৎসার নিশ্চয়তা পান এবং একটি পরিবার পানীয় জলের জন্য আর হাহাকার করে না তখনই বলা যায় উন্নয়ন সত্যিই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।
এই বাস্তব চিত্রই আজ ধরা পড়ছে মালদার গাজোল ব্লকের রানীগঞ্জ–১ গ্রাম পঞ্চায়েতে।স্বচ্ছ প্রশাসন, সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার সমন্বয়ে এই পঞ্চায়েত ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ব্লকের অন্যতম পঞ্চায়েত।
সম্প্রতি প্রকাশিত পঞ্চায়েতের বার্ষিক খতিয়ান যেন এক উন্নয়ন-ডায়েরি—যেখানে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন বদলের গল্প।
প্রশাসনিক দক্ষতায় দৃঢ় নেতৃত্ব
একটি পঞ্চায়েতের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তার নেতৃত্ব। সঠিক পরিকল্পনা, সময়মতো কাজের বাস্তবায়ন এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে সফল প্রশাসন।রানীগঞ্জ–১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সেবিকা মণ্ডল এবং উপ-প্রধান মধুমিতা মণ্ডল দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।তাঁদের নেতৃত্বে পঞ্চায়েত অফিসে নিয়মিত প্রকল্পের মনিটরিং চলছে।
সেবিকা মন্ডল
প্রধান
রানীগঞ্জ-১ গ্রাম পঞ্চায়েত

মধুমিতা মন্ডল
উপ-প্রধান
রানীগঞ্জ-১ গ্রাম পঞ্চায়েত
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগে যেসব ছোট সমস্যার সমাধানে মাসের পর মাস সময় লাগত, এখন সেগুলোর সমাধান হচ্ছে অল্প সময়েই। ফলে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে বহুগুণ।
জনবিন্যাস ও রাজনৈতিক ভারসাম্য
পঞ্চায়েত এলাকার মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০,৫০০। জনসংখ্যার প্রায় ৯৯ শতাংশ হিন্দু এবং ১ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। বহু সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও এখানে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রয়েছে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও রয়েছে ভারসাম্য। মোট ১৩ জন সদস্যের মধ্যে

তৃণমূল কংগ্রেস – ৮ জন
বিজেপি – ৪ জন
নির্দলীয় – ১ জন
দলীয় মতভেদ থাকলেও উন্নয়নের প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন। পঞ্চায়েত বোর্ডে উন্নয়নই মুখ্য এজেন্ডা-এই মানসিকতা রানীগঞ্জ–১-কে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নে নজিরবিহীন উদ্যোগ
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া কোনও অঞ্চলের সার্বিক বিকাশ সম্ভব নয়।সেই উপলব্ধি থেকেই গত আর্থিক বছরে পঞ্চায়েত এলাকায় প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে পরিকাঠামো নির্মাণে।
রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা
গ্রামের বহু কাঁচা রাস্তা বর্ষাকালে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ত। সেই সমস্যা দূর করতে প্রায় ৩ কিলোমিটার নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।এছাড়া ১ কিলোমিটার পাকা ড্রেন তৈরি হওয়ায় জল জমার সমস্যা অনেকটাই কমেছে।
স্কুলপড়ুয়া থেকে কৃষক সবার যাতায়াতে এখন অনেকটাই সুবিধা হয়েছে।
আলোকসজ্জা
রাতে অন্ধকারে দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা ছিল দীর্ঘদিনের। গ্রামকে আলোকিত করতে বসানো হয়েছে
২৪টি সোলার লাইট
৫টি ভ্যাপর ল্যাম্প
ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে।
পানীয় জল ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য বিশুদ্ধ জল অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যেই বসানো হয়েছে ২০টি সাব-মার্সিবল পাম্প। পাশাপাশি ৩টি নতুন শৌচালয় এবং একটি সাব-সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে।
এখন সাধারণ অসুস্থতায় দূরে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে না গ্রামেই মিলছে প্রাথমিক চিকিৎসা।

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বর্তমান সময়ে গ্রামাঞ্চলেও বর্জ্য সমস্যা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রানীগঞ্জ–১ এই বিষয়ে নিয়েছে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আওতায়
৩টি ডাস্টবিন বা ভ্যাট
বর্জ্য সংগ্রহের ট্রলি ভ্যান
নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ফলে গ্রাম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন।

সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে সাফল্যের গল্
শুধু ইট-পাথরের উন্নয়ন নয়, মানুষের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষাই প্রকৃত উন্নয়ন। এই ক্ষেত্রে
রানীগঞ্জ–১ গ্রাম পঞ্চায়েত রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার
প্রায় ৭,০০০ মহিলা নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। অনেক পরিবারে এই অর্থই মাসিক সংসারের বড় ভরসা।
স্বাস্থ্যসাথী
প্রায় ৬,০০০ পরিবার বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা পাচ্ছে। বড় রোগের খরচ এখন আর আতঙ্ক নয়।
বার্ধক্য ও মানবিক ভাতা
৩,০০০ প্রবীণ নাগরিক
১৫০ বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি
নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। ফলে তাঁদের জীবনযাত্রা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হয়েছে।

কৃষক বন্ধু
প্রায় ৩,০০০ কৃষক আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। বীজ, সার বা চাষের খরচ জোগাতে এই প্রকল্প তাঁদের বড় সহায়ক।
কন্যাশ্রী ও রূপশ্রী
* ৭০০ কন্যাশ্রী
* ১৫০ রূপশ্রী
নারীশিক্ষা ও বিবাহে আর্থিক সহায়তা দিয়ে মেয়েদের ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে।
মানুষের মুখে উন্নয়নের কথা
সংখ্যা অনেক সময় বাস্তব চিত্র বোঝাতে পারে না। তাই স্থানীয়দের কথাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান,
“আগে ভাতা পেতে কত দৌড়োদৌড়ি করতে হত। এখন সময়মতো ব্যাংকে টাকা চলে আসে।
এক কৃষক বলেন,
“কৃষক বন্ধু প্রকল্পে যে টাকা পাই, তাতে চাষের অনেকটা খরচ উঠে যায়।
এক গৃহবধূর কথায়,লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা দিয়ে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাই।
এইসব ছোট ছোট কথাই বড় সাফল্যের সাক্ষী।

আগামী দিনের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা
বর্তমান সাফল্যে থেমে নেই পঞ্চায়েত। ভবিষ্যতের জন্য নেওয়া হয়েছে একাধিক বড় পরিকল্পনা।
২.৫ কিমি সড়ক সংস্কার
হাতিণ্ডা মোড় থেকে হরি মন্দির পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলে যাবে।
পিকনিক স্পটের সৌন্দর্যায়ন
স্থানীয় পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পিকনিক স্পট উন্নত করা হবে। বসার জায়গা, আলো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি করে একে আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুশীলন
প্রতিটি প্রকল্পের হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত সভা এবং সামাজিক নিরীক্ষা এই তিনটি প্রক্রিয়া পঞ্চায়েতের কাজকে করেছে স্বচ্ছ।
ফলে মানুষ জানেন, তাঁদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে। এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই প্রশাসনের প্রতি আস্থা তৈরি করেছে।
রানীগঞ্জ–১:এক শিক্ষণীয় মডেল
গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে রানীগঞ্জ–১ এখন এক আদর্শ উদাহরণ। এখানে দেখা যাচ্ছে—
পরিকল্পনা
স্বচ্ছতা
মানুষের অংশগ্রহণ
সামাজিক সুরক্ষা
এই চারটি বিষয় একসঙ্গে থাকলে উন্নয়ন কতটা কার্যকর হতে পারে।
গ্রামই ভারতের প্রাণ। সেই গ্রামের উন্নয়ন হলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। রানীগঞ্জ–১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রমাণ করে দিয়েছে—সদিচ্ছা, সঠিক নেতৃত্ব এবং মানুষের সহযোগিতা থাকলে সীমাবদ্ধ সম্পদ নিয়েও বড় পরিবর্তন আনা যায়।
রাস্তা, আলো, জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বয়ে এই পঞ্চায়েত আজ এক নতুন ইতিহাস লিখছে।
হয়তো খুব শীঘ্রই রানীগঞ্জ–১-কে দেখা যাবে ব্লকের সেরা নয়, জেলার অন্যতম সেরা ‘মডেল গ্রাম পঞ্চায়েত’ হিসেবে।
আর সেই গল্পই বলে দিচ্ছে-
উন্নয়ন মানে শুধু প্রকল্প নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের মুখে হাসি।

