নয়া জামানা ডেস্ক : সামান্য বানানের ভুল বা পদবির হেরফের, এই অজুহাতে কোনো প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত মামলায় নির্বাচন কমিশনকে এভাবেই সতর্ক করল শীর্ষ আদালত। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল শোনার পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভোটারদের শুনানির নোটিস পাঠানোর ক্ষেত্রে কমিশনকে আরও সংবেদনশীল এবং মানবিক হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের এই হাই-ভোল্টেজ মামলায় আগামী সোমবার ফের শুনানি হবে।
চলতি ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যের অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চে সশরীরে উপস্থিত থেকে সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি ছিল, বাংলার কয়েক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর সওয়াল এবং তাঁর আইনজীবীর দেওয়া পরিসংখ্যান শোনার পর আদালত কমিশনকে একাধিক নির্দেশ দেয়। বিচারপতিরা জানান, বাংলা ভাষা বোঝেন এমন অফিসারদের মাধ্যমেই তথ্য যাচাই করতে হবে। রাজ্য সরকারকে দ্রুত সেই অফিসারদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘বিচারের বাণী কাঁদছে। আমি নির্বাচন কমিশনের কাছে ছয়টি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু আমায় তার উত্তর দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখানে আমি নিজের দলের জন্য লড়াই করছি না। মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কথা বলছি।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বাংলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘রাজ্যে একশো জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভাবতে পারেন! বাংলাকে ইচ্ছেকৃতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। কেন অসমে করা হয়নি?’
এসআইআর প্রক্রিয়ায় তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে প্রচুর মানুষকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান আদালতে পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ১৬ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৮ লক্ষ ভোটারের শুনানি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড় শুনানির সংখ্যা ১.৮ লক্ষ। এখনও ৬৩ লক্ষ মানুষের শুনানি বাকি। হাতে সময় আছে মাত্র চার দিন। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুনানির শেষ দিন। শ্যাম দিওয়ানের দাবি, বাকি চার দিনে সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে হলে প্রতিদিন ১৫.৫ লক্ষ মানুষের শুনানি করতে হবে, যা বাস্তবে অসম্ভব। এই পাহাড়প্রমাণ চাপের মুখে তড়িঘড়ি নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
আদালতে শুনানির সময় মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে ৮,৩০০ জন মাইক্রো অবজার্ভার আনা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘ইআরও-র কোনও ক্ষমতা নেই। রোল পর্যবেক্ষক বিজেপিশাসিত রাজ্য থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। ৫৮ লক্ষের নাম বাদ দিয়েছে। অনেকে জীবিত রয়েছেন। মাইক্রো অবজার্ভাররা তাদের নাম মুছে দিচ্ছেন।’ তাঁর চূড়ান্ত আবেদন ছিল, ‘শুধুমাত্র বাংলার জন্য মাইক্রো অবজার্ভার। আমার শেষ আবেদন, মাইক্রো অবজার্ভারদের প্রত্যাহার করুন। গণতন্ত্রকে বাঁচান। আমি খুবই ধন্য হয়েছি। মানুষের অধিকার রক্ষা করুন।’
কমিশনের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয় যে, রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত গ্রুপ-বি অফিসার না দেওয়ার কারণেই অন্য রাজ্য থেকে লোক আনতে হয়েছে। তবে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, সোমবারের মধ্যে রাজ্যকে জানাতে হবে তারা কতজন বাংলা জানা অফিসার দিতে পারবে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলা জানা অফিসার থাকলে ভিন রাজ্যের মাইক্রো অবজার্ভারের আর প্রয়োজন থাকবে না। প্রধান বিচারপতি বলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকা বাংলায় ছিল, তাই অনুবাদের সময় বানানে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এই কারণে কোনও প্রকৃত ভোটারকে বঞ্চিত করা যাবে না।
কমিশনকে ভর্ৎসনা করে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘আপনাদের অফিসারদের একটু সংবেদনশীল হতে বলুন!’ পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বুথ স্তরের আধিকারিকদের (বিএলও) স্বাক্ষর ছাড়া কোনো নথি বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর আশঙ্কা ছিল যে প্রায় ২ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ছক কষা হয়েছে। ইতিমধ্য়ে ৫৮ লক্ষের নাম বাদ গিয়েছে এবং আরও ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। তিনি নির্বাচন কমিশনারদের ভূমিকা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগে নির্বাচন সদনের বাইরে এসে দাবি করেছিলেন যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তাঁদের অপমান করেছেন। তিনি তুলনা টেনে বলেন, ‘এর আগে আমরা অনেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার দেখেছি। টিএন সেশন থেকে শুরু করে এসওয়াই কুরাইসিরা নিজেদের কাজ খুব ভালোভাবে করতেন। শক্ত হাতে কাজ সামলাতেন। এমন দালাল আগে কখনও দেখিনি।’ সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর সেই লড়াই জারি রাখলেন। আগামী সোমবারের শুনানির দিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্য রাজনীতি। মমতা আবেদন জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ীই যেন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গে।
ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশনের ওয়েবসাইটে সব অসঙ্গতি আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত মনে করে, একজন ভোটার কেন শুনানির নোটিস পাচ্ছেন, তা জানার অধিকার তাঁর রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে এই সওয়াল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এতে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়বে। এখন দেখার, সোমবার রাজ্য সরকারের অফিসারদের তালিকা পাওয়ার পর আদালত মাইক্রো অবজার্ভারদের বিষয়ে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
ফাইল ফটো।