নয়া জামানা ডেস্ক : লড়াইটা এবার সরাসরি রাজপথ থেকে সংসদের অন্দরে নিয়ে যেতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সংসদে ইমপিচমেন্ট বা বরখাস্তের প্রস্তাব আনতে কোমর বেঁধে নামছে ঘাসফুল শিবির। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানী দিল্লির বঙ্গভবনে দলের সাংসদদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই রণকৌশল চূড়ান্ত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংবিধানিক রীতি মেনে এই প্রস্তাব পেশ করতে প্য়োজন অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর। বর্তমানে তৃণমূলের হাতে ৪১ জন সাংসদ থাকলেও মমতা-শিবির আত্মবিশ্বাসী যে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব এবং এমকে স্ট্যালিনের মতো বিজেপি-বিরোধী নেতাদের সমর্থনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাতত্ত্ব তারা সহজেই ছুঁয়ে ফেলবে। জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও জোরালো করতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
রাজধানীর রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তৃণমূল নেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই লড়াই আদতে গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। সেই পদের অমর্যাদা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের বর্তমান শক্তি ৪১ জন সাংসদে দাঁড়িয়ে। মৌসম বেনজির নুর ইস্তফা দেওয়ার পর এই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছে জোড়াফুল শিবির। ১০০ জন সাংসদের সই জোগাড় করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হলেও তৃণমূল একে এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল হিসেবে দেখছে। একদিকে বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া মঞ্চের দলগুলিকে পাশে পাওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে বিরোধীদের সদিচ্ছা পরীক্ষা করা। তৃণমূল মনে করছে, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব কিংবা আরজেডি-র তেজস্বী যাদব এই পদক্ষেপে পূর্ণ সমর্থন দেবেন। ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিনের সঙ্গেও মমতার সখ্য সর্বজনবিদিত।
ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হলে সংসদের অন্দরে বিজেপির স্বরূপ উন্মোচিত হবে বলে দাবি করছে তৃণমূল। এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত পাশ হবে কি না তা নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বও সন্দিহান, কারণ এনডিএ সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সংখ্যা রয়েছে। কিন্তু লড়াইটা মূলত নৈতিক। নির্বাচন কমিশনকে বিজেপি-র শাখা সংগঠন হিসেবে দাগিয়ে দিতে চাইছে কংগ্রেস-সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও। সেই আবহেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুর সপ্তমে চড়ালেন মমতা। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া বা এসআইআর নিয়ে বাংলায় যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তাকেই এবার দিল্লির মঞ্চে হাতিয়ার করলেন তিনি। এর আগে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতির বিরুদ্ধে একই রকম প্রস্তাব এনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন বিরোধীরা, তবে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের ইস্তফায় তা থমকে গিয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মমতা বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বেন না।
চাণক্যপুরীর নতুন বঙ্গভবনে এদিন যেন এক খণ্ড বাংলা উঠে এসেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির মিডিয়াকে সরাসরি ‘ভূত’ দেখালেন। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া অথচ জীবন্ত একদল মানুষকে হাজির করে তিনি কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিলেন। দিল্লিতে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তৃণমূল নেত্রীর ক্ষোভের আগুনে তপ্ত ছিল সাংবাদিক সম্মেলন। মমতা অভিযোগ করেন যে নির্বাচন কমিশনের তালিকায় অনেকেই ‘মৃত’, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সশরীরে হাজির। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে এঁদের নাম নেই। মমতা আক্রমণাত্মক ঢঙে বলেন, ‘তথ্য অসংগতির তালিকা দিতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। তারা নাম বদলে দিচ্ছে। বিজেপি নেতাদের অবজার্ভার করে পাঠাচ্ছে। আমি সবাইকে দোষ দিচ্ছি না। আমি কমিশনকে সম্মান করি। তবে কয়েকজন তোতাপাখির মতো কাজ করছেন।’
মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় ছিল ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকাও। তিনি দাবি করেন যে তাঁর নিজের বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই ৪৫ হাজার মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় কমিশনকে সরাসরি ‘হত্যাকারী’ বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। মমতার পাশে বসেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর-এর ফলে ‘আক্রান্ত’ পরিবারগুলির দুঃখের কথা তুলে ধরেন। তৃণমূলের দাবি, এসআইআর-এর নামে আসলে ভোটার তালিকা ঝাড়াই-বাছাই করে বিজেপি সুবিধা নিতে চাইছে। অন্যদিকে বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করছে যে ভুতুড়ে ভোটারদের বাদ দিতেই এই প্রক্রিয়া। মমতা কিন্তু অনড়। তিনি দিল্লির সংবাদমাধ্যমের সামনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে বাংলায় বিজেপি আসবে না কারণ মানুষ তাদের ঘৃণা করে। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার শুনানি রয়েছে। তার আগেই দিল্লির মাটিতে এই শক্তিমহড়া রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গেল মেজাজে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে দিল্লির সাংবাদিকদের আগাম মিষ্টি খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিয়ে রাখলেন। একগাল হেসে মমতা বলেন, ‘তা হলে ঠিক আছে! আবার দেখা হবে জেতার পরে। তখন ভাল মিষ্টি খাওয়াব। তবে ‘দিল্লি কা লাড্ডু’ নয়!’ তিনি আরও বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার দাবি করেছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের জল্পনাও এদিন উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে বঙ্গে তৃণমূল একাই লড়াই করবে। অধীর চৌধুরীর কড়া সমালোচনার জবাবে মমতার রণনীতি হল একলা চলো রে। আগামী নির্বাচনে তৃণমূলের আসন ও ভোট শতাংশ দুই-ই বাড়বে বলে অভিষেকও বারবার দাবি করছেন। সব মিলিয়ে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আর রাজপথের লড়াইয়ের মিশেলে বাংলার রাজনীতি এখন দিল্লির অলিন্দে কাঁপন ধরাচ্ছে। ছবি—সোশ্যাল মিডিয়া ।