নয়া জামানা ডেস্ক : আনন্দপুরের ভস্মীভূত গুদামের টিনের চাল আর পোড়া কংক্রিটের নিচ থেকে একের পর এক বেরোচ্ছে হাড়-মাংসের দলা। গত মঙ্গলবারের সেই বিধ্বংসী আগুনের রেশ চার দিন কাটলেও কাটেনি আতঙ্ক। এখনও নিখোঁজ ২৭ জন। উদ্ধার হয়েছে ২১টি দেহাংশ। বিভীষিকার সেই কালো ধোঁয়ায় কত প্রাণ ছাই হয়ে গিয়েছে, তার সঠিক হিসেব এখনও মেলেনি। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুক্রবার মৃতদের পরিবারের জন্য ২ লক্ষ এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন তিনি। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের তরফে মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার কথা আগেই জানানো হয়েছে। শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখনও পর্যন্ত মোমো সংস্থার দুই আধিকারিকসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার রাতের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এখন গোটা রাজ্যের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। পূর্ব কলকাতার উপকণ্ঠ আনন্দপুরের নাজিরাবাদে যেখানে এক সময়ে ব্যস্ত গুদাম ছিল, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিখোঁজ ডায়েরির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭-এ। বারুইপুর পুলিশ জেলার এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত ২১টি দেহাংশ উদ্ধার করা গিয়েছে। তবে সেগুলি ঠিক কতজন মানুষের, তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তদন্তকারীরা। পোড়া দেহাংশগুলি শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় সেগুলিকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি বা সিএফএসএল-এ পাঠানো হয়েছে। বারুইপুর জেলা পুলিশ সুপার শুভেন্দ্র কুমার নিজে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে পরীক্ষার তদারকি করছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট এলেই নিখোঁজদের ভাগ্যের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে শুক্রবার সমাজমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর শোকবার্তা জানান। তিনি লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের আনন্দপুরে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’ একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে নিহতদের নিকটাত্মীয়কে ২ লক্ষ টাকা ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। এই আর্থিক সাহায্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় পক্ষ থেকেই বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হলেও শোকার্ত পরিবারগুলোর চোখে এখন কেবল স্বজন হারানোর জল। মঙ্গলবারই পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা সাহায্যের কথা জানিয়েছিলেন।
এদিকে প্রশাসনিক সক্রিয়তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। শুক্রবার দুপুরে তিনি আনন্দপুরের দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া মোমো কারখানা ও ডেকরেটরের গুদামের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। রাজ্যপাল বলেন, ‘দোষ খুঁজতে নয়, তথ্য অনুসন্ধানে এসেছি। তবে প্রশাসনকে আরও বেশি সতর্ক হতে হত। ঘটনার পর এ ভাবে দায় এড়ানো যায় না।’ রাজভবন সূত্রের খবর, এই ঘটনার বিশদ রিপোর্ট তলব করা হতে পারে। রাজ্যপাল আসার আগে সেখানে যান ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা ধ্বংসস্তূপ থেকে পোড়া তার, রাসায়নিক ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করেন। জেসিবি মেশিন দিয়ে টিনের শেড সরিয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে আর কোনও প্রাণের চিহ্ন অবশিষ্ট আছে কি না।
পুলিশি তদন্তেও গতি এসেছে। বৃহস্পতিবার রাতে নরেন্দ্রপুর এলাকা থেকে ‘ওয়াও মোমো’ সংস্থার দুই শীর্ষ আধিকারিককে পাকড়াও করেছে পুলিশ। ধৃতরা হলেন ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী। শুক্রবার তাঁদের বারুইপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। এর আগেই পুলিশ গ্রেফতার করেছিল গুদামের মালিক তথা ডেকরেটর ব্যবসায়ী গঙ্গারাম দাসকে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, গুদামটিতে অগ্নিিনর্বাপক ব্যবস্থার চূড়ান্ত অভাব ছিল। নিয়ম না মেনেই সেখানে দাহ্য পদার্থ মজুত রাখা হয়েছিল। গুদামের ভেতর প্রচুর কর্মী থাকলেও তাঁদের বেরোনোর পর্যাপ্ত পথ ছিল না। তিন ধৃতকে জেরা করে এই অবহেলার উৎস খুঁজতে চাইছে বারুইপুর জেলা পুলিশ।
আনন্দপুরের এই বিপর্যয় ফের একবার কলকাতার উপকণ্ঠের গুদামগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে এমন দাহ্য পদার্থের মজুত চলত, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশাসনের টনক নড়লে হয়তো এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরতে হতো না এই অভিযোগই এখন নাজিরাবাদের অলিতে গলিতে। শুক্রবার দিনভর ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছিলেন নিখোঁজদের পরিজনেরা। ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত তাঁদের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হওয়ার নয়। পোড়া গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে এখন কেবলই অপেক্ষা, প্রিয়জনের অন্তত একটি চিহ্ন পাওয়ার।