নয়া জামানা ডেস্ক : স্বাধীনতার ৭৫ বছর পার করেও কি সমাজ আবার জাতিগত বিভাজনের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্ন তুলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্ণবৈষম্য রুখতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তৈরি বিতর্কিত নয়া বিধিমালার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য দূর করার নামে আদতে নতুন করে বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ সাফ জানিয়েছে, আদালত অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হতে পারে। আপাতত ২০২৬ সালের ওই নয়া বিধির কার্যকারিতা বন্ধ রেখে ২০১২ সালের পুরনো নিয়মই বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউজিসির আনা ‘প্রোমোশন অফ ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশন্স, ২০২৬’ বিধিমালাটি শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফসিলি জাতি, জনজাতি, অনগ্রসর শ্রেণি, প্রতিবন্ধী এবং মহিলা প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘ইক্যুইটি কমিটি’ গড়তে হবে। চালু করতে হবে ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন। কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত হয় বর্ণবৈষম্যের সংজ্ঞা নিয়ে। নতুন নিয়মে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ বা জাতিভিত্তিক বৈষম্য বলতে কেবল এসসি, এসটি এবং ওবিসিদের বিরুদ্ধে হওয়া হেনস্থাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে সাধারণ বা অসংরক্ষিত শ্রেণির পড়ুয়ারা এই সুরক্ষাকবচের বাইরে থেকে যাচ্ছিলেন।
এই পক্ষপাতমূলক সংজ্ঞার বিরুদ্ধেই সরব হয়েছিল ছাত্রসমাজের একাংশ। অভিযোগ ওঠে, নতুন বিধিতে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে উচ্চবর্ণের পড়ুয়াদের নিশানা করার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষিতেই বৃহস্পতিবার উষ্মা প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কি আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যা উল্টে জাতিগত বৈষম্যের পথে ফিরে যাচ্ছে? বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আমরা এতদিন যা যা অর্জন করেছি, সব কি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে?’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই বিধি শিক্ষাঙ্গনের মতো প্রগতিশীল পরিবেশকে আরও বিষিয়ে দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি ছিল, ক্যাম্পাসে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া বৈষম্য রুখতেই এই কড়া পদক্ষেপ। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ ১১৮.৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯-২০ সালে অভিযোগের সংখ্যা যেখানে ১৭৩ ছিল, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৮-এ। নয়া বিধিতে নিয়মভঙ্গকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের মতো চরম হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই যুক্তিতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে বিধির ভাষাগত অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতিরা।
শীর্ষ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে পুরো বিধিমালাটি পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। যতদিন না সেই পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে এবং পরবর্তী নির্দেশ আসছে, ততদিন পুরনো নিয়মেই চলবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। আদালতের এই হস্তক্ষেপের ফলে আপাতত স্বস্তিতে অসংরক্ষিত শ্রেণির পড়ুয়ারা। তবে শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত সাম্য ফেরাতে শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেয় ইউজিসি, এখন সেটাই দেখার।