নয়া জামানা ডেস্ক : আই-প্যাক দফতরে ইডির তল্লাশিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে নবান্নের সামনে ধর্না দিতে চেয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই আবেদন খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। নবান্নের পরিবর্তে মন্দিরতলা বাসস্ট্যান্ডের সামনে শান্তি বজায় রেখে ৫০ জন বিধায়ককে নিয়ে ধর্না দিতে পারবেন শুভেন্দুরা। তবে শুধু নবান্ন অভিযান নয়, আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ড নিয়েও রাজ্য রাজনীতি বর্তমানে উত্তাল। নাজিরাবাদে আগুনের ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে বিজেপির মিছিল করার আর্জিও মঞ্জুর করেছে আদালত। তবে সেখানেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কড়া শর্ত। এই টানাপড়েনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকেলে আনন্দপুরের অকুস্থলে পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারী। ১৬৩ ধারা জারি থাকায় ১০০ মিটার দূর থেকেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর রাজধর্ম পালন নিয়ে কড়া সমালোচনা শোনা যায় তাঁর মুখে।
আই-প্যাক এবং ইডি কাণ্ড নিয়ে রাজ্য রাজনীতি গত কয়েকদিন ধরেই সরগরম। কয়লা পাচার মামলায় আই-প্যাকের ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে ইডি আধিকারিকরা বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সেখানে পৌঁছে ফাইল ও হার্ড ডিস্ক উদ্ধার করেন বলে দাবি বিরোধীদের। এই ঘটনার প্রতিবাদেই নবান্নের সামনে ধর্নার ডাক দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের একক বেঞ্চ আগে শর্তসাপেক্ষে মন্দিরতলায় ধর্নার অনুমতি দিলেও নবান্নের জেদ ধরে ডিভিশন বেঞ্চে গিয়েছিল বিজেপি। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ এদিন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নবান্নের সামনে ধর্না দেওয়া যাবে না। একক বেঞ্চের নির্দেশ মেনেই মন্দিরতলায় বেলা ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করতে হবে। কোনও মাইক ব্যবহার করা যাবে না এবং মঞ্চের মাপ হতে হবে ১২/১৫ ফুট। অনুষ্ঠান শেষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জায়গা পরিষ্কার করার দায়িত্বও বিজেপির।
অন্য দিকে, আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পথে নামছে গেরুয়া শিবির। রবিবারের সেই আগুনে মোমো কারখানা ও ডেকরেটর গুদাম পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত ১৯ জনের দেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপির মিছিলের আবেদন শুনে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছে, সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ৩টের মধ্যে মিছিল শেষ করতে হবে। মিছিলে ২ হাজার জনের বেশি সমর্থক থাকতে পারবেন না। রুট হিসেবে শীতলা মন্দির থেকে ইএম বাইপাস হয়ে নরেন্দ্রপুর থানার ২০০ মিটার আগে পর্যন্ত পথ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মিছিল শেষে পাঁচ জনের একটি প্রতিনিধি দল থানায় স্মারকলিপি জমা দিতে পারবে।
আদালতের নির্দেশের পর আজ বিকেলে সশরীরে আনন্দপুরে পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারী। এলাকাটি ঘিরে রাখা পুলিশি গার্ডরেলে ১৬৩ ধারা জারির বিজ্ঞপ্তি সাঁটানো ছিল। পাঁচ জনের বেশি জমায়েত সেখানে নিষিদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমি আইন মেনে চলি। ১০০ মিটার দূর থেকেই দেখব।’ তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিজেপি বিধায়করাও। ঘটনাস্থলে না গিয়েও শুভেন্দু ক্ষোভ উগরে দেন সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী তাঁর রাজধর্ম পালন করেননি। তাঁর বাড়ি এখান থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। তাঁর আসা উচিত ছিল।’ বিরোধী দলনেতার আশঙ্কা, এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে ।
আনন্দপুরের এই ঘটনায় ইতিমধ্যে গুদাম মালিককে গ্রেফতার করা হলেও ফায়ার অডিট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি। জলাজমি ভরাট করে কীভাবে কারখানা গড়ে উঠল, সেই অভিযোগও সামনে এসেছে। শুভেন্দু জানান, তৃণমূল নেতারা সেখানে গেলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। শাসকদল তাদের কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বিরোধীদের সেখানে যেতে হচ্ছে। যদিও পুলিশের দাবি, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার ভয়েই সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, কাল অর্থাৎ শুক্রবার নির্দিষ্ট শর্ত মেনে বিজেপি তাদের মিছিল করতে পারবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভা ভোটের আগে আই-প্যাক এবং আনন্দপুর ইস্যুকে হাতিয়ার করে শাসকদলের উপর চাপ বাড়াতে চাইছে বিজেপি। পাল্টা তৃণমূলের দাবি, তল্লাশির নামে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী কৌশল হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল ইডি, যা রুখে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
আগামী কয়েকদিন এই দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তার ইঙ্গিত এদিন শুভেন্দুর এলাকা পরিদর্শন এবং আদালতের রায়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিরোধী দলনেতার স্পষ্ট কথা, “আমরা বিধায়ক। আমরা আইন মানা লোক।” কিন্তু একই সঙ্গে রাজধর্ম পালনের প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিঁধতেও ছাড়েননি তিনি। এখন মন্দিরতলার ধর্না মঞ্চ এবং শুক্রবারের মিছিল থেকে বিজেপি কী বার্তা দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল। ফাইল ফটো।