নয়া জামানা ডেস্ক : অবতরণের মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগের কথা। রানওয়ে ছুঁই-ছুঁই চাকা, অথচ মাটি ছোঁয়া আর হলো না। বারামতীর ঘন কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ি এলাকায় আছড়ে পড়ল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের চার্টার্ড বিমান। চোখের পলকে দাউদাউ আগুন আর লেলিহান শিখায় ছাই হয়ে গেল সব। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারালেন মহারাষ্ট্রের অন্যতম দাপুটে নেতা ও এনসিপি প্রধান অজিত পওয়ার। একইসঙ্গে মৃত্যু হয়েছে বিমানে থাকা আরও চারজনের। এই মর্মান্তিক পরিণতির রেশ কাটতে না কাটতেই জাতীয় রাজনীতিতে দানা বাঁধছে রহস্য। নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর দাবিতে এখন সরগরম দিল্লি থেকে মুম্বই। তবে বুধবার রাতে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানান এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা শরদ পওয়ার। এ বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তদন্তের দাবির কার্যত বিরোধিতা করে শরদ বলেন,কলকাতা থেকে একটি প্রতিক্রিয়ায় দাবি করা হয়েছে যে এই ঘটনায় কিছু রাজনীতি জড়িত। কিন্তু এ রকম কিছুই নেই। এতে কোনও রাজনীতি নেই। এটি একটি দুর্ঘটনা। আমি এতে রাজনীতি না আনার অনুরোধ করছি।
বুধবার সকাল পৌনে ৯টা নাগাদ মুম্বই থেকে বারামতীতে নিজের গড়ে ফিরছিলেন অজিত। লক্ষ্য ছিল আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের প্রচার।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, অবতরণের প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয়বার নামতে গিয়েছিল লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের ‘ভিটি-এসএসকে’ বিমানটি। প্রায় ১০০ ফুট উপর থেকে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে রানওয়ের একদম কিনারায় মুখ থুবড়ে পড়ে সেটি। এর পরেই বিকট চার-পাঁচটি বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে এলাকা। ডিজিসিএ সূত্রে খবর, অজিত পওয়ার ছাড়াও মৃতদের তালিকায় রয়েছেন তাঁর দুই নিরাপত্তাকর্মী, পাইলট ও ফার্স্ট অফিসার। বারামতী বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শিবাজি তওয়ারে জানান, বিমানটি ভেঙে পড়ার পর টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ঘন কুয়াশাকে দায়ী করা হলেও উঠছে যান্ত্রিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রশ্ন।
এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘জননেতা অজিত পওয়ারের সংযোগ ছিল তৃণমূল স্তরে। তাঁর অকাল প্রয়াণে আমি শোকস্তব্ধ। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা।’ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এই মৃত্যুকে ‘অপরণীয় ক্ষতি’ বলে বর্ণনা করেছেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশের কথায়, ‘ব্যক্তিগতভাবে উনি আমার কাছে একজন দক্ষ নেতা ও বন্ধুও। মহারাষ্ট্রের বিকাশের জন্য উনি যা অবদান রেখে গিয়েছেন, আরও অনেক কাজ করতে পারতেন।’ তবে এই শোকবার্তার মধ্যেই আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, এই ঘটনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক অঙ্ক লুকিয়ে থাকতে পারে।
সিঙ্গুরে যাওয়ার পথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের দাবি তুলেছেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সির উপর অনাস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন। অন্য কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দিয়ে নয়। বরং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হোক।’ তাঁর এই সন্দেহের মূলে রয়েছে মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। অজিত পওয়ার বিজেপি-নেতৃত্বাধীন ‘মহাজুটি’ সরকার ছাড়তে চাইছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন তুলে মমতার বয়ান, ‘আমি জানি না, এই দুর্ঘটনার পিছনে আসল কারণ কী। দুদিন আগে আমি সামাজিক মাধ্যমে জানতে পারি, অন্য এক দলের নেতা স্টেটমেন্ট দেন, অজিত পাওয়ার বিজেপি সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইছি। আর তারপরই এই দুর্ঘটনা। আমি এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই।’
মুখ্যমন্ত্রীর সুরে সুর মিলিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীও। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ভাড়া করা প্লেনে যাচ্ছেন, তাঁর মৃত্যু হল, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করি। বিমান দুর্ঘটনার নেপথ্যে কোনও ষড়যন্ত্র নেই তো?’ মহারাষ্ট্রের অন্দরে জল্পনা ছিল, ২০২৪-এর ভোটের ফলের পর দুই পওয়ার শিবির (শরদ ও অজিত) ফের এক হয়ে যেতে পারে। কাকা-ভাইপোর দূরত্ব মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে অজিত বলেছিলেন, ‘আপনার মুখে ঘি-শক্কর।’ অর্থাৎ মিলনের সম্ভাবনা তিনি হেসেই মেনে নিয়েছিলেন। সেই পুনর্মিলনের আগেই কি পথ পরিষ্কার করা হলো? এই প্রশ্নই এখন জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে গোটা ঘটনা খতিয়ে দেখছে ডিজিসিএ। বারামতীর পাহাড়ে যখন পোড়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে, তখন নিজের দিল্লি সফর স্থগিত করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘তদন্ত হোক’ এই আওয়াজ এখন দিল্লি ছাড়িয়ে গোটা দেশের রাজনীতির শিরোনামে। ছবি: পিটিআই।