নয়া জামানা ডেস্ক : রাজ্যে বেজে গেল বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা। রবিবাসরীয় বিকেলে দিল্লির বিজ্ঞান ভবন থেকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা করলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এ বার বঙ্গে ভোট হবে মাত্র দু’দফায়। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হবে ১৫২টি আসনে। দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল, যার আওতাভুক্ত ১৪২টি আসন। আগামী ৪ মে নির্ধারিত হবে বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্য, ওই দিনই হবে ভোটগণনা। ভোট ঘোষণার মুহূর্ত থেকেই রাজ্যজুড়ে কার্যকর হয়েছে আদর্শ আচরণবিধি। রাজদণ্ড এখন সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের হাতে।
নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কারণ, বর্তমান সপ্তদশ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ওই দিনই। গতবার অর্থাৎ ২০২১ সালে নজিরবিহীনভাবে আট দফায় ভোট হয়েছিল বাংলায়। সে বার ২ মার্চ ভোট ঘোষণা হয়েছিল এবং ভোট শেষ হতে হতে মে মাস ছুঁয়েছিল। এবার সেই দফায় ব্যাপক কাটছাঁট করল কমিশন। দফাসংখ্যা কমানো প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানান, ‘কমিশন মনে করছে দফা কমানো প্রয়োজন। সকলের পক্ষে সুবিধাজনক এমন একটি পর্যায়ে এটি নামিয়ে আনা দরকার।’ সুষ্ঠু ও অবাধ ভোটদান নিশ্চিত করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য।
বঙ্গ রাজনীতির উত্তাপ এখন তুঙ্গে। বিজেপি থেকে কংগ্রেস ও বাম— সব পক্ষই দফাসংখ্যা কমানোর পক্ষে সওয়াল করেছিল প্রথম থেকে। শাসক দল তৃণমূলের পক্ষ থেকে দফার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান না নেওয়া হলেও, তারা প্রতিটি যোগ্য ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পরিবর্তনের ঝড়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে টানা তিনবার তারা শাসনভার সামলাচ্ছে। গতবার ২০২১ সালে প্রবল রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও অতিমারির আবহেও ২১৩টি আসনে জিতে বিপুল জয় পেয়েছিল ঘাসফুল শিবির। এবার বিজেপিও জয়ের বিষয়ে সমান আশাবাদী। মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই ব্রিগেডের সমাবেশ থেকে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে বাংলাকে ‘বিকশিত বাংলা’ করার ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্যদিকে, কংগ্রেস এবার একক শক্তিতে ২৯৪টি আসনেই লড়ার কথা ঘোষণা করেছে। বামেদের কৌশল এখনও ধোঁয়াশায় মোড়া। আইএসএফ বা অন্য কোনো দলের সঙ্গে তারা মোর্চা গড়বে কি না, তা নিয়ে ধন্দ কাটেনি।
কমিশন সূত্রে খবর, এবার পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ। এর মধ্যে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার জন নতুন ভোটার, যাদের বয়স ১৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৩১ লক্ষ। রাজ্যে মোট বুথের সংখ্যা ২ লক্ষ ১৯ হাজারের বেশি। প্রতিটি বুথেই স্বচ্ছতার খাতিরে ১০০ শতাংশ ওয়েবকাস্টিং করা হবে। প্রতি দু’ঘণ্টা অন্তর ভোটদানের হার ঘোষণা করবে কমিশন। কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ভোটাররা কোনোভাবেই বুথের ভেতরে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। ভিন রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পর্যবেক্ষক মোতায়েনের ক্ষেত্রেও কোনো খামতি রাখছে না কমিশন। মোট ১৫ লক্ষ ভোটকর্মী নিয়োগ করছে কমিশন। নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ।
ভোট ঘোষণার ঠিক আগেই রাজ্য সরকারের পুরোহিত ও মোয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জ্ঞানেশ কুমার বলেন, ‘আদর্শ আচরণবিধি এখন থেকে কার্যকর হয়ে গেল। আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার আগে কোনও সরকার কোনও পদক্ষেপ করলে করতেই পারে। কিন্তু এখন থেকে আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকবে।’ অর্থাৎ এখন থেকে সরকার কোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা করতে পারবে না। প্রশাসনের রাশ এখন পুরোপুরি কমিশনের নিয়ন্ত্রণে।
প্রথম দফার ভোট হবে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমের জেলাগুলিতে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, দুই দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদের পাশাপাশি পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূমের ১৫২টি আসনে ২৩ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। এই দফার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৬ এপ্রিল, স্ক্রুটিনি ৭ এপ্রিল এবং প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল ভোট হবে নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানের ১৪২টি আসনে। এই দফার মনোনয়ন জমার শেষ দিন ৯ এপ্রিল, স্ক্রুটিনি ১০ এপ্রিল এবং প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৩ এপ্রিল।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও পুদুচেরি, কেরল এবং অসমে ভোট ৯ এপ্রিল। তামিলনাড়ুতে এক দফায় ভোট ২৩ এপ্রিল। এর পাশাপাশি গুজরাত, গোয়া, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রের মোট আটটি বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। সব জায়গার ফলাফলই জানা যাবে ৪ মে। কমিশন জানিয়েছে, গোটা প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪৯ হাজার মাইক্রো অবজার্ভার এবং ১,৪৪৪ জন অবজার্ভার কাজ করবেন। ফেক নিউজ রুখতে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বাংলার প্রতিটি বুথে যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে গিয়ে ছাপ দিতে পারেন, তার জন্য পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছে নির্বাচন সদন। এখন দেখার, ৪ মে গণনার পর বাংলার মসনদ কার দখলে থাকে। ফাইল ফটো।