নয়া জামানা ডেস্ক : ভারতীয় সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথম বার এমন পদক্ষেপের সাক্ষী হতে চলেছে সংসদ। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে কোমর বেঁধে নামল বিরোধী শিবির। শুক্রবার সংসদের যেকোনো একটি কক্ষে এই মর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিস জমা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই ১৯৩ জন সাংসদ সেই অপসারণ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন। যার মধ্যে শুধু লোকসভারই রয়েছেন ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন সদস্য। তৃণমূল থেকে কংগ্রেস, এমনকি বিরোধী জোটের বাইরে থাকা আম আদমি পার্টিও দিল্লির মসনদে ‘নিরপেক্ষতার অপমৃত্যু’র অভিযোগে এককাট্টা হয়েছে।
বিরোধী শিবিরের অভিযোগের তির মূলত জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতির দিকে। লোকসভায় তৃণমূলের উপদলনেতা শতাব্দী রায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, ১৩০ জন সাংসদের সই সম্বলিত এই নোটিস বিচারবিভাগীয় পদ্ধতির আদলেই পেশ করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, লোকসভায় ১০০ এবং রাজ্যসভায় ৫০ জন সাংসদের সমর্থন থাকলে তবেই এই প্রস্তাব তোলা যায়। এক্ষেত্রে সংখ্যার সেই ‘ম্যাজিক ফিগার’ অনায়াসেই পার করেছে বিরোধীরা। মূলত পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, বৈষম্য এবং নির্বাচনে জালিয়াতির তদন্তে বাধা দেওয়ার মতো সাতটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বর্তমান সিইসি-র বিরুদ্ধে।
বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই লড়াই আরও তীব্র। ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক দিন ধরেই সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিতেই যোগ্য ভোটার এবং সংখ্যালঘুদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি জীবিত মানুষকেও নথিতে মৃত দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এই প্রসঙ্গে তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘তৃণমূল ছাড়া ও অন্যান্য বিরোধী দলের প্রায় ১৫০ জনেরও বেশি সাংসদ সমর্থন জানিয়েছেন ৷ এরপর লোকসভা স্পিকারের কাছে জমা পড়বে এই প্রস্তাব ৷’ তাঁর দাবি, শাসকদলের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত রেখে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো ভেঙে ফেলছেন জ্ঞানেশ কুমার।
জানা গেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি হবে সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ধাঁচে। সংবিধানের নিয়ম বলছে, সিইসি-কে সরাতে হলে সংসদের দুই কক্ষেই ‘বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ প্রয়োজন। অর্থাৎ, কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং উপস্থিত ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন জরুরি। ১৯৬৮ সালের বিচারপতি (অনুসন্ধান) আইন অনুসারে, উভয় কক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হলে তবেই লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান মিলে যৌথ তদন্ত কমিটি গড়বেন।
বিজেপির স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধীও আগে একাধিকবার সরব হয়েছেন। বিরোধীদের দাবি, বিএলও-দের ওপর অত্যধিক কাজের চাপ এবং ভোটারদের হয়রানি এখন চরমে। ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান থেকে শুরু করে দিল্লির সদর দফতরে দরবার কোনো কিছুতেই ফল না মেলায় এবার সরাসরি সংসদীয় যুদ্ধের পথে হাঁটল বিরোধীরা। বাজেট অধিবেশনের এই দ্বিতীয় পর্বে জ্ঞানেশ কুমারের ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেয়, এখন নজর সেদিকেই।