নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটে ফেরার লড়াইয়ে বামেদের সামনে এখন আসন রফার কঠিন অঙ্ক। কংগ্রেস হাত ছেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শূন্যের গেরো কাটাতে মরিয়া বিমান বসু-মহম্মদ সেলিমরা আইএসএফ এবং ছোট দলগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধতে চাইলেও জট কাটছে না কিছুতেই। একদিকে শরিকি আবদার, অন্যদিকে আইএসএফ-এর জোরালো দাবি, সব মিলিয়ে আলিমুদ্দিনের নেতাদের কাছে সহজ পাটিগণিত এখন রীতিমতো জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের বাদ্যি বাজার অপেক্ষায়। তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধী সব শক্তিকে এক ছাতার তলায় আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বাম নেতৃত্ব। কিন্তু মুখে বলা যতটা সহজ, ভোটের ময়দানে আসন বণ্টনের বাস্তব পরিস্থিতি ততটাই কঠিন। নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন ভাগ করতে গিয়ে শরিক হারানোর ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে সিপিআইএম-কে। দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রামচন্দ্র ডোম এই আশঙ্কার কথা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘দশের লাঠি একের বোঝা। সেই দশটি লাঠি থেকে একটি লাঠি কমে যাক আমরা চাইছি না।’ তবে লাঠি ইতিমধ্যেই একটি কমেছে। ২০১৬ ও ২০২১ সালে সঙ্গী থাকা কংগ্রেস এবার ২৯৪টি আসনেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে কংগ্রেসের ছেড়ে যাওয়া আসনগুলো নিয়ে বাম শিবিরের অন্দরে টানাটানি শুরু হয়েছে। শরিক দলগুলো সেই আসন হাতাতে কোমর বেঁধে নেমেছে। এর মধ্যেই ডানকুনির রাজ্য সম্মেলন থেকে দেওয়া ‘বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ঐক্য’ গড়ার ডাক সফল করতে চাইছে সিপিআইএম। সিপিআই (এমএল) লিবারেশন এবং ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার (জেএলকেএম) মতো শক্তিগুলোকে জোটে টানার চেষ্টা চলছে। জঙ্গলমহলে ১১টি আসনে লড়তে চেয়ে ইতিমধ্যে সিপিআইএম-এর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সেরে ফেলেছে জেএলকেএম। সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএসএফ। গতবার সংযুক্ত মোর্চার একমাত্র জয়ী বিধায়ক ছিলেন নওশাদ সিদ্দিকী। এবার তাঁদের দাবির পারদ আরও চড়া। আপাতত ২৬টি আসনে রফা হলেও উত্তর ২৪ পরগনার কয়েকটি আসন নিয়ে দড়ি টানাটানি অব্যাহত। বিশেষ করে দেগঙ্গার মতো আসনে গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চাইছে না আইএসএফ। নওশাদ সিদ্দিকী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বামেদের সঙ্গে আইএসএফের জোট হচ্ছে, এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তৃণমূল-বিজেপির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে আমরা জোটবদ্ধ হচ্ছি। এবার এরকমটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গতবার দেগঙ্গাতে আমাদের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী দিয়েছিল। এবারে যতদূর আলোচনা হয়েছে সেই সমস্যা থাকবে না বা ঘটবে না। সে বিষয়টা স্পষ্ট। ঠিক এ কারণেই কিছুটা সময় বেশি লাগছে।’ কংগ্রেস বিহীন এই জোটে আইএসএফ-কে কোনোভাবেই হারাতে চান না সেলিমরা। কারণ নওশাদরা সরে গেলে জোটের শক্তি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে। সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর আসন রফার কথা ঘোষণার পরিকল্পনা থাকলেও আইএসএফ-এর আপত্তিতেই তা থমকে গিয়েছে। রামচন্দ্র ডোম মনে করেন, ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে কংগ্রেস ভুল পথে হেঁটেছে। তাঁর বিশ্লেষণ, ‘ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর বাধ্যবাধকতা ছিল একত্রিত হওয়ার। কিন্তু, কংগ্রেস সেই পথে হাঁটল না। ভুল পথে চালিত হল। এর ফলে, বাম-গণতান্ত্রিক ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তি কিছুটা হলেও দুর্বল হয়েছে। তাদের শূন্যস্থান পূরণে অন্যান্য সহযোগীরা সংখ্যা বাড়াতে চাইছে।’ তবে ছোট দলগুলোর শক্তির সীমাবদ্ধতা মনে করিয়ে দিতেও ভোলেননি তিনি। তাঁর মতে, ‘কিন্ত, চাইলেই তো হবে না। এই সময়ে দাঁড়িয়ে দাবির সঙ্গে তাদের শক্তি-সামর্থ্য কতটা আছে কি না, হিসেব করে দেখা উচিত। তবে, এটা ঠিক আমরা আশাব্যাঞ্জক জায়গাতেই আছি। পরিস্থিতি জটিল হলেও উপযুক্ত কার্যকরী লড়াই দেওয়ার মতো জায়গাতে আমরা জোটবদ্ধ হচ্ছি।’ নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ ঘুরে যাওয়ার পর ভোট ঘোষণা এখন সময়ের অপেক্ষা। এই সময়ের মধ্যেই কি সব জটিলতা কাটিয়ে বামেরা পারবে সুষ্ঠুভাবে আসন ভাগ করতে? আলিমুদ্দিনের অন্দরে এখন এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।