নয়া জামানা ডেস্ক : রাজ্যের দুই হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের ভোটার সংখ্যায় বড়সড় রদবদল ঘটল। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরে ভোটারের সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর গড় নন্দীগ্রামে ভোটার সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। শনিবার প্রকাশিত এই অসম্পূর্ণ চূড়ান্ত তালিকায় রাজ্যজুড়ে কয়েক লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তালিকায় শুধু সাধারণ মানুষ নন, শাসকদলের বিধায়ক, কাউন্সিলর এমনকি খোদ বিডিও-র নামও ‘বিবেচনাধীন’ বা ‘বাতিল’ তালিকায় চলে আসায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর সময় ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৬ হাজার ২৯৫। গত ১৬ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, ৪৪ হাজার ৭৮৬ জনের নাম বাদ পড়েছে। শনিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় আরও ২ হাজার ৩২৪ জনের নাম বাদ গেল। সব মিলিয়ে মমতার কেন্দ্রে মোট ৪৭ হাজার ৯৪ জনের নাম বাদ পড়েছে। বর্তমানে এই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ২০১। শুধু নাম বাদ যাওয়াই নয়, ভবানীপুরে আরও ১৪ হাজার ১৫৪ জনের নাম এখনও ‘অমীমাংসিত’ তালিকায় রয়েছে। নথি যাচাইয়ের পর এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্টো চিত্র নন্দীগ্রামে। সেখানে খসড়া তালিকার তুলনায় ভোটার বেড়েছে ৭৭০ জন। বর্তমানে এই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ২ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭৮। নন্দীগ্রামে ১,১৬৭ জনের নাম নতুন করে তালিকায় উঠলেও ৩৯৭ জনের নাম বাদ পড়েছে। তবে এই তালিকার বড় অংশই এখনও চূড়ান্ত নয়। কমিশনের হিসেবে, নন্দীগ্রামেও ৮ হাজার ৮১৯ জন ভোটারের তথ্য এখনও ঝুলে রয়েছে।
ভোটার তালিকায় এই পরিবর্তনের চেয়েও বেশি চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বাদের তালিকায় থাকা নামগুলো নিয়ে। নৈহাটি পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত সরকার ও তাঁর মা আরতি সরকারের নাম সরাসরি ‘ডিলিটেড’ বা বাদ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় নাম থাকলেও ‘বিচারাধীন’ বা ‘বিবেচনাধীন’ ক্যাটেগরিতে রাখা হয়েছে বীরভূম জেলা পরিষদের তৃণমূল সভাধিপতি কাজল শেখ ও তাঁর মাকে। একই বিপত্তিতে পড়েছেন আমডাঙার তিন বারের তৃণমূল বিধায়ক রফিকুর রহমান। এমনকি যে প্রশাসন এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, সেই প্রশাসনের প্রতিনিধি খোদ সন্দেশখালি-১ ব্লকের বিডিও সায়ন্তন সেনের নামও বিচারাধীন তালিকায়। সায়ন্তনবাবুর কথায়, ‘ভোটার লিস্টে আমার নামের পাশে বিচারাধীন রয়েছে। কী আর করা যাবে। যা হয়েছে সেটা তো মেনে নিতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে যা যা পদক্ষেপ আছে সেগুলি সেই ভাবে মেনে কাগজপত্র দাখিল করব।’
কমিশনের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপাকে পড়েছেন খোদ বুথ লেভেল অফিসাররাও (বিএলও)। কাটোয়া বিধানসভা কেন্দ্রের ১২ নম্বর বুথের বিএলও আয়েশা খাতুন এবং ১০ নম্বর বুথের বিএলও আতিয়ার রহমানের নামও ঝুলে রয়েছে বিচারাধীন তালিকায়। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় রাজ্যজুড়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম বাদ গিয়েছিল। শনিবারের তালিকায় আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম আপাতত বাদ গেল। সব মিলিয়ে বাদের খাতা ৬৩ লক্ষ ছাপিয়ে গিয়েছে। তবে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নথি এখনও যাচাই শেষ হয়নি। সেগুলি এখনো বিচারাধীন তালিকায়
রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল অবশ্য এই বিশৃঙ্খলাকে বড় করে দেখতে নারাজ। তাঁর মতে, ‘কিছু ভুলভ্রান্তি’ এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অস্বাভাবিক নয়। তিনি জানিয়েছেন, ভুল যেখানে ধরা পড়েছে, সেখানে দ্রুত পদক্ষেপ করছে কমিশন। কিন্তু শাসকদল তৃণমূল ইতিমধ্যেই কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করে সরব হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নাম কেন যাচাইয়ের তালিকায় রাখা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সব মিলিয়ে এই তালিকা প্রকাশ হতেই রাজ্যের ভোট-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। আগামী দিনে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হলে তবেই স্পষ্ট হবে শেষ পর্যন্ত কতজন ভোটারের ভোটাধিকার বজায় থাকল।
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ২৮ ফেব্রুয়ারির কাজের ভিত্তিতেই এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে কমিশনার জানিয়েছেন, আপাতত ৬০ লক্ষ নাম ‘বিচারাধীন’ হিসাবে রয়েছে। অর্থাৎ সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাম বাদ পড়ার সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলাশাসকের দফতর ও বিডিও অফিসগুলোতে তালিকা পৌঁছানো শুরু হয়েছে। এদিকে অশান্তি এড়াতে মালদহ, কৃষ্ণনগর, মুর্শিদাবাদ ও কোচবিহার এই চার জেলাতে অজয় নন্দ, গৌরব শর্মা, রশিদ মুনির খান এবং সুনীল কুমার যাদব এই চারজন সিনিয়র আইপিএস অফিসারকে মোতায়েন করা হয়েছে।