নয়া জামানা ডেস্ক : আকাশ চিরে ধেয়ে আসছে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র। কান ফাটানো বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে পারস্য উপসাগরের তীর। শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয়ে যায় ‘অপারেশন লায়ন্স রোর’। আমেরিকার সরাসরি মদতে ইরানের বুকে কার্যত তাণ্ডব চালাল ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে ইসফাহান, কেরমানশাহ সর্বত্রই এখন ধ্বংসের চিহ্ন। রয়টার্স সূত্র অনুযায়ী,ইজ়রায়েলি হানায় মৃত্যু হয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজ়াদা ও শীর্ষ কম্যান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরর। তবে যুদ্ধের সবচেয়ে করুণ ছবি ধরা পড়েছে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে। সেখানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ায় অন্তত ৮৫ জন নিষ্পাপ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে । যুদ্ধের আগুনে এখন পুড়ছে গোটা পশ্চিম এশিয়া।
শনিবার সকালে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘লায়ন্স রোর’। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ‘রাইজ়িং লায়ন’ নামে একটি অভিযান চালিয়েছিল তেল আভিভ। এবার তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়েছে ইজ়রায়েলি বাহিনী। তেহরানের আকাশজুড়ে এখন সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ। নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। খোদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের দপ্তরের খুব কাছেই পর পর বিস্ফোরণ ঘটেছে। রয়টার্স সূত্রে খবর, পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে খামেনেইকে তেহরান থেকে সরিয়ে কোনও এক গোপন ডেরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই হামলার স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজ়রায়েল কাটজ় দাবি করেছেন, ‘হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছিল আমাদের দেশে। তাই আত্মরক্ষার্থেই এই হামলা চালানো হয়েছে।’
তবে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে ইরান রিভোলিউশনারি গার্ড। ইজ়রায়েলের রাজধানী তেল আভিভ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তারা। ইরানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, ‘যখন আলোচনার রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে, সেই সময় আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে এই হামলা চালানো হয়েছে। যার সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুত তেহরান।’ শুধু ইজ়রায়েল নয়, পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা একাধিক মার্কিন ঘাঁটির ওপর হানা দিয়েছে ইরানি ফৌজ। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার এবং বাহরিনের মার্কিন সামরিক ছাউনি লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ। দুবাই ও দোহাতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহাতে ইরানি হামলায় এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর মিলেছে।
মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা গিয়েছে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে। ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ বাহিনীর ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আছড়ে পড়ে একটি স্কুলে। সেই সময় স্কুল চলছিল। মুহর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ভবনটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, অন্তত ৮৫ জন ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এই বর্বরোচিত হামলায়। মৃতদের অধিকাংশই নাবালিকা। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই ধ্বংসলীলার মাঝেও ইরানবাসীর উদ্দেশে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এ বার আপনাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সময় এসে গিয়েছে। ক্ষমতা বদলের জন্য প্রস্তুত হোন।’ ট্রাম্পের সাফ কথা, ‘ইরানকে পরমাণু অস্ত্র প্রকল্প থেকে নিরস্ত করে তবেই ক্ষান্ত হব। ওদের এই কাজ সফল হতে দেব না।’
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের এই দামামা বেজে ওঠায় প্রবল উদ্বেগে ভারত। নয়াদিল্লির বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারত অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমরা সব পক্ষকে উত্তেজনা কমিয়ে সংযম প্রদর্শন ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ যুদ্ধের ফলে ব্যাহত হয়েছে বিমান পরিষেবাও। দিল্লি থেকে তেল আভিভগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান মুম্বইয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইজ়রায়েল ও ইরানে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে দূতাবাস। সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘যুদ্ধ এড়িয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধান করার আবেদন জানাচ্ছে ভারত। সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার আবেদন জানাচ্ছি আমরা।’
এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। আমেরিকার দীর্ঘদিনের বন্ধু পাকিস্তান এবার সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও বিদেশমন্ত্রী ইশক দার এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। ইশক দার ইরানের বিদেশমন্ত্রীকে ফোন করে জানিয়েছেন, ‘এই হামলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’ পাকিস্তানের এই অবস্থান আমেরিকার সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে লোহিত সাগরে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। তারা আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জানিয়েছে, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ইজ়রায়েলের ওপর বড়সড় হামলা চালাতে তারা প্রস্তুত।
শনিবার রাত গড়াতেই গোটা পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ইরান ও ইরাক তাদের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ইজ়রায়েলের আকাশসীমাও। তেহরান ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়ন (এফআইআর) জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও বিমান চলাচল করবে না। ইরানের বিদেশ মন্ত্রক হুমকি দিয়েছে, ‘আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সেনা অভিযানের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ানো হবে।’ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ইরান সাফ জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের কল্যাণে পরমাণু প্রকল্প চালাচ্ছে। যদিও আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের দাবি, ইরান ইউরেনিয়াম সঞ্চয় করে পরমাণু বোমা তৈরির পথে হাঁটছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়া এখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। একদিকে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের ‘সিংগহর্জন’, অন্যদিকে ইরানের ‘বদলা’ এই দ্বৈরথে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও নিষ্পাপ শিশুরা। খামেনেইকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় তেহরানে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসেব এখনও মেলেনি। তবে ৮৫ জন ছাত্রীর মৃত্যু সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ‘রাশিয়া আগের মতোই, আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বার্থের ভারসাম্যের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে যে কোনও সাহায্যের জন্য প্রস্তুত।’ কিন্তু আলোচনার টেবিল ছেড়ে এখন যুদ্ধের ময়দানেই সব ফয়সালা করতে মরিয়া মনে দুই পক্ষ। ছবি—সোশ্যাল মিডিয়া ।