নয়া জামানা ডেস্ক : দোরগোড়ায় ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কুর্সিচ্যুত করতে এবার রাজ্যজুড়ে ৫০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পরিবর্তন যাত্রা’র ডাক দিল ভারতীয় জনতা পার্টি। শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্ট এই কর্মসূচিতে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়ায় গেরুয়া শিবিরের অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটানোর পথে আইনি বাধা কাটল। তবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সময়ের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ। আগামী ১ মার্চ থেকে রাজ্যের নয়টি সাংগঠনিক বিভাগে এই যাত্রা শুরু হচ্ছে। ১৪ মার্চ ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মেগা সমাবেশের মাধ্যমে এই কর্মসূচির পরিসমাপ্তি ঘটবে।
শুক্রবার হাই কোর্টের রায়ে জানানো হয়েছে, ১ এবং ২ মার্চ দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই মিছিল করা যাবে। কোনওভাবেই জমায়েত ১০০০ জন অতিক্রম করা চলবে না। আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব বর্তেছে পুলিশের ওপর। বিজেপি সূত্রে খবর, দোল উৎসবের কারণে ৩ ও ৪ মার্চ যাত্রা স্থগিত থাকবে। ৫ মার্চ থেকে ফের পূর্ণদ্যোমে শুরু হবে কর্মসূচি। এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে ২৫০টিতে পৌঁছে যাওয়া। বাকি ৪৪টি কেন্দ্রে ব্রিগেড সমাবেশকে কেন্দ্র করে পৃথক কর্মসূচি পালিত হবে।
শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের গলায় এদিন শোনা গিয়েছে পরিবর্তনের তীব্র হুঙ্কার। কলকাতার এক অনুষ্ঠানে যাত্রার টিজার ও পুস্তিকা প্রকাশ করে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা আপনাদের কাছে সর্বস্তরে পরিবর্তনের লক্ষ্যে এগোচ্ছি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, যেকোনও রাজনৈতিক দলের মানুষ এই পরিবর্তন যাত্রায় যোগদান করুন এটাই চাই।’ তাঁর সংযোজন, ২০১১ সালে বাম শাসনের অবসানের পর মানুষ সার্বিক পরিবর্তন চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রাপ্তি হয়েছে কেবল একদলীয় শাসনের বদল।
পরিবর্তন যাত্রার রুট ম্যাপ অনুযায়ী, ১ মার্চ কোচবিহার, কৃষ্ণনগর, কুলটি ও গড়বেতা থেকে যাত্রার সূচনা হবে। ২ মার্চ ইসলামপুর, হাসন, সন্দেশখালি ও আমতায় কর্মসূচি রয়েছে। বিশেষ নজর থাকছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির দিকে। সেখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের যাত্রার সূচনা করার কথা ছিল ১ মার্চ। তবে সফরসূচি একদিন পিছিয়ে যাওয়ায় শাহ সম্ভবত ২ মার্চ রায়দিঘিতে উপস্থিত থাকবেন। বিজেপি জানিয়েছে, এই যাত্রায় কেন্দ্রীয় স্তরের ওজনদার নেতাদের মেলা বসবে বাংলায়। রাজনাথ সিং, জেপি নাড্ডা এবং নিতিন নবীনের মতো হেভিওয়েটরা বিভিন্ন জনসভায় অংশ নেবেন।
রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তোপ দেগেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানান, ‘বদলা নয় বদল চাইয়ের স্লোগান দিলেও রাজ্যে সীমাহীন তোষণ, রাজনৈতিক সন্ত্রাস দেখেছে বাংলার মানুষ। তাই পরিবর্তন হবেই।’ শুভেন্দুর দাবি, ৫০০০ কিলোমিটারের এই রুট ম্যাপের মাধ্যমে তাঁরা জনমানসে পৌঁছতে চান। ইতিমধ্যেই সদস্যতা অভিযানের মাধ্যমে বিজেপি রাজ্যে ৫০ লক্ষ সদস্য সংগ্রহ করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হৃত গৌরব ফেরানোর যে গ্যারান্টি দিয়েছেন, এই যাত্রা সেই সুরকেই গ্রাম-গঞ্জে পৌঁছে দেবে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের দাবি আরও জোরালো। তিনি এই যাত্রাকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই যাত্রা পরিবর্তনের গঙ্গাকে ভগীরথের মতো পথ দেখাবে। এই যাত্রায় লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করবেন। বাংলার মানুষের মনের ক্ষোভ দেখতে পাবেন।’ সুকান্তবাবুর মতে, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুরেও মানুষ এখন বদল চাইছেন। বিজেপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ৬৪টি বড় জনসভা এবং ৩০০টি ছোট সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ২৫০টি জায়গায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই যাত্রাকে স্বাগত জানাবেন।
বিজেপির এই মেগা পরিকল্পনায় বাদ রাখা হয়েছে কেবল কলকাতা মহানগর বিভাগকে। কারণ, ব্রিগেডের সমাবেশের মূল দায়িত্ব এই বিভাগের কাঁধেই রয়েছে। শমীক ভট্টাচার্যের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুর্নীতি ও তৃণমূল এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আবেদন জানান, ‘আমরা চাই তৃণমূলের যাঁরা ওই অমৃত রস পান করেননি, কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী, বামেরাও এতে যোগদান করুন। আমাদের আবেদন পশ্চিমবঙ্গকে গভীর অসুখ থেকে বের করে আনতে হবে। তার লক্ষ্যেই এই যাত্রা।’
সব মিলিয়ে, বিধানসভা ভোটের অনেক আগে থেকেই মাটি কামড়ে লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছে গেরুয়া শিবির। ২০২১-এর ‘যোগদান মেলা’র বদলে এবার সরাসরি জনসংযোগ ও পদযাত্রাকেই হাতিয়ার করতে চাইছে তারা। উচ্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সীমিত জনবল নিয়ে বিজেপি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সেটাই দেখার। তবে ব্রিগেডে মোদীর উপস্থিতিতে এই যাত্রার সমাপ্তি যে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়াবে, তা নিশ্চিত। ছবি সোশ্যাল মিডিয়া।