নয়া জামানা: শহুরে জীবনে ‘লিভ-ইন রিলেশনশিপ’ শব্দটি এখনও অনেকের কাছে বিতর্কের বিষয়। কেউ এটিকে আধুনিকতার নাম দিয়ে গ্রহণ করেন কেউ আবার পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বলে সমালোচনা করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভারতে এমন এক আদিবাসী সমাজ রয়েছে যেখানে বিয়ের আগে একসঙ্গে থাকা কোনো নতুন ধারণা নয় বরং হাজার বছরের পুরনো এক স্বীকৃত সামাজিক প্রথা। রাজস্থান ও গুজরাট সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী গরাসিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে এই রীতি ‘দাপা’ নামে পরিচিত যা তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গরাসিয়া সমাজে প্রেম, সম্পর্ক এবং দাম্পত্য—সবকিছুর ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মতি ও স্বাধীনতা। এখানে কিশোর-কিশোরীরা বিশেষ মেলা বা সামাজিক উৎসবে নিজেদের পছন্দের সঙ্গী বেছে নেয়। এরপর তারা পরিবার বা সমাজের চাপ ছাড়াই একসঙ্গে বসবাস শুরু করে। শুরুতে কোনো ধর্মীয় বা আইনি বিয়ের বন্ধন থাকে না। বরং দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার পর সন্তান জন্ম হলে বা আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। অনেক সময় দেখা যায় জীবনের শেষ বয়সে নাতি-নাতনিদের উপস্থিতিতে দম্পতিরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন যা এক অনন্য সামাজিক দৃশ্য।
এই প্রথার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায় শুধু নারীর নয় বরং উভয়ের। কোনো সম্পর্কে অসন্তুষ্ট হলে নারী সহজেই সরে এসে নতুন সঙ্গী বেছে নিতে পারেন।ফলে জোরজবরদস্তি বা সামাজিক চাপের জায়গা নেই। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই খোলামেলা মনোভাবের কারণেই গরাসিয়া সমাজে ধর্ষণ, পণের দাবিতে নির্যাতন বা নারীহত্যার মতো অপরাধ প্রায় অনুপস্থিত। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিয়ের ভার ছেলের পরিবারের ওপর থাকায় অযথা খরচের চাপ তৈরি হয় না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিবর্তন এলেও প্রথার মূল দর্শন আজও অটুট। আধুনিক আইনি কাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকেই এখন লিখিত চুক্তি করছেন। তবুও সম্পর্কের ভিত্তি রয়ে গেছে সম্মান, ভালোবাসা ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর। গরাসিয়াদের জীবনধারা মনে করিয়ে দেয়, প্রগতিশীলতা বাহ্যিক নয় মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি এবং সমান অধিকারের মধ্যেই তার আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে।