ব্রেকিং
  • Home /
  • প্রথম পাতা /
  • নির্মলার বাজেটে ‘বঞ্চনা’ বাংলার ! ভোটের মুখে কেন ‘বিমাতৃসুলভ’ দিল্লি

নির্মলার বাজেটে ‘বঞ্চনা’ বাংলার ! ভোটের মুখে কেন ‘বিমাতৃসুলভ’ দিল্লি

টিঙ্কু দত্ত ||নয়া জামানা ||কলকাতা লোকসভা মিটেছে, সামনেই বাংলা-সহ একাধিক রাজ্যের হাইভোল্টেজ বিধানসভা ভোট। এখন বিজেপি কাছে পাখির চোখ বাংলার নির্বাচন। আর বাংলা দখল করতে কোমর বেঁধে নেমছে বিজেপি । বঙ্গ সফরে এসে দিচ্ছে একগুচ্ছ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি । কিন্তু কেন্দ্রীয়....

নির্মলার বাজেটে ‘বঞ্চনা’ বাংলার ! ভোটের মুখে কেন ‘বিমাতৃসুলভ’ দিল্লি

টিঙ্কু দত্ত ||নয়া জামানা ||কলকাতা লোকসভা মিটেছে, সামনেই বাংলা-সহ একাধিক রাজ্যের হাইভোল্টেজ বিধানসভা ভোট। এখন বিজেপি....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন

টিঙ্কু দত্ত ||নয়া জামানা ||কলকাতা

লোকসভা মিটেছে, সামনেই বাংলা-সহ একাধিক রাজ্যের হাইভোল্টেজ বিধানসভা ভোট। এখন বিজেপি কাছে পাখির চোখ বাংলার নির্বাচন। আর বাংলা দখল করতে কোমর বেঁধে নেমছে বিজেপি । বঙ্গ সফরে এসে দিচ্ছে একগুচ্ছ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি । কিন্তু কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলার জন্য তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না বলে অভিযোগ উঠছে । দেখা গেছে এর আগে ভোটমুখী বিহারের জন্য রাজকোষ উপুড় করে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ, আর এখন ভোটমুখী বাংলার কপালে জুটল স্রেফ বঞ্চনা আর দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকাঠামো প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি। রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের পর রাজনৈতিক মহলে এই তপ্ত আলোচনা শুরু হয়েছে। বিহারের জন্য যখন প্রায় ৬০ হাজার কোটির ঝুলি বরাদ্দ হয়েছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের ভাগে এসেছে নগণ্য কিছু ঘোষণা। যার সংখ্যা বিহারের অর্ধেকেরও কম। শিলিগুড়ি-বারাণসী হাইস্পিড রেল করিডর, ডানকুনি-সুরত ফ্রেট করিডর এবং দুর্গাপুর শিল্প করিডর— এই তিনটি মাত্র প্রকল্পের নাম শোনা গিয়েছে নির্মলার কণ্ঠে। অথচ গত দু’টি বাজেটে বিহারের জন্য বিমানবন্দরের বিস্তার থেকে শুরু করে বিশেষ বোর্ড গঠন— সবকিছুতেই দরাজ ছিল দিল্লি। এই বিমাতৃসুলভ আচরণকে ঘিরেই এখন রণংদেহি মেজাজে তৃণমূল শিবির।

রবিবার বাজেট পেশের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেজাজ হারাননি ঠিকই, তবে তীব্র শ্লেষের সঙ্গে বাজেটকে ‘গার্বেজ অফ লাই’ বা মিথ্যার জঞ্জাল বলে অভিহিত করেছেন। দিল্লি যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে মুখ্যমন্ত্রী সাফ বলেন, ‘এই বাজেট হচ্ছে গার্বেজ অফ লাই। গোটা দেশে এখন একটাই কর কাঠামো, জিএসটি। বাংলার থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। একটা টাকাও রাজ্যকে দিচ্ছে না। যে টাকার কথা বলা হয়েছে, সব আমাদের টাকা।’ মমতা আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, শিলিগুড়ি বা ডানকুনির যেসব করিডরের কথা আজ ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হল, তার পরিকল্পনা অনেক আগেই তিনি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন করে রেখেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বিজেপি জানে তারা বাংলায় রাজনৈতিকভাবে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। তাই ভোট পাবে না জেনেই পশ্চিমবঙ্গকে এই চরম বঞ্চনার শিকার হতে হল। তিনি এই বাজেটকে ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ বলে কটাক্ষ করে জানান, শেয়ার বাজারের ধস প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই বাজেট কতটা লক্ষ্যহীন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুর আরও চড়া। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এই বাজেটকে সরাসরি ‘বিমাতৃসুলভ’ তকমা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ৮৫ মিনিটের বাজেট বক্তৃতায় বাংলার মানুষের স্বার্থে কোনও দিশা নেই। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে হারের পর থেকেই বিজেপি যে বাংলার টাকা আটকে রেখেছে, সেই অভিযোগ ফের সামনে এনেছেন তিনি। অভিষেক বলেন, ‘বাংলায় ওরা হারছে। তাই বিজেপি বিমাতৃসুলভ মনোভাব নিয়ে বাংলার মানুষকে শিক্ষা দিতে চাইছে। আসন্ন নির্বাচনে মানুষ বিজেপিকে সমুচিত জবাব দিয়ে দেবে।’ তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে জানান, ২০২১ সালের পর রাজ্যের একজন মানুষও যদি ১০০ দিনের কাজের টাকা পেয়ে থাকেন, তবে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। তাঁর মতে, এই বাজেট পুরোপুরি দিশাহীন এবং ভিত্তিহীন। বাংলার প্রতি দিল্লির এই অবহেলা আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির জন্য বুমেরাং হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন তিনি।

কেন বিহার পেল ঢালাও বরাদ্দ আর বাংলা পেল স্রেফ ঘোষণা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পিছনে রয়েছে দিল্লির সরকারের স্থায়িত্বের সমীকরণ। বিহারের নীতীশ কুমার এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু বর্তমানে মোদী সরকারের প্রধান ‘ক্রাচ’। তাঁদের সন্তুষ্ট রাখা বিজেপির জন্য এখন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, বাংলা থেকে বিজেপি গত বিধানসভা ও লোকসভায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় একধরণের ‘উপেক্ষা’ কাজ করছে। যদিও কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো অবিজেপি রাজ্যগুলোর দিকে অর্থমন্ত্রী নজর দিয়েছেন নারকেল বা কাজুবাদাম শিল্পের মাধ্যমে, বাংলার ক্ষেত্রে স্রেফ পরিকাঠামোতেই থমকে গিয়েছে দিল্লি। এই পরিকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে কর্মসংস্থান বা তৎক্ষণাৎ আর্থিক সুরাহার কোনও পথ বাংলার জন্য খোলা রইল না।

বিজেপি অবশ্য বঞ্চনার এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, রাজ্যে গত ১৫ বছরের ‘তোলাবাজি’ সংস্কৃতির কারণে শিল্প বিদায় নিয়েছে। এমতাবস্থায় ডানকুনি বা দুর্গাপুরের মতো শিল্প করিডরের ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, বিহারের জন্য যখন আইআইটির পরিকাঠামো উন্নয়ন বা মাখনা চাষিদের জন্য বিশেষ বোর্ডের ঘোষণা হয়, তখন বাংলার আলু বা পাট চাষিরা কেন বঞ্চিত থাকবেন? উত্তরবঙ্গের জন্য স্রেফ একটি রেল করিডর কি যথেষ্ট? নির্মলার বাজেট বক্তৃতায় তামিলনাড়ু বা কেরলের অর্থনীতি গুরুত্ব পেলেও বাংলার ‘ভোটমুখী’ গুরুত্ব সেভাবে ধরা পড়েনি।

মুখ্যমন্ত্রী বারবার অভিযোগ তুলেছেন যে, রাজ্যের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষায় কোনও বরাদ্দ নেই। বরং বারাণসীকে ‘ডিজ়নিল্যান্ড’ বানানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। বাংলার থেকে সব টাকা জিএসটি-র নামে তুলে নিয়ে গিয়ে বিজেপি শাসিত বা শরিকি রাজ্যগুলোকে তুষ্ট করা হচ্ছে। এই অভিযোগকে ঢাল করেই তৃণমূল এখন আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে তুলতে চাইছে। দিল্লি বনাম বাংলার এই সংঘাত যে রবিবারের বাজেটের পর আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলার মানুষের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন— রাজনৈতিক লড়াইয়ের খেসারত কি এভাবেই দিতে হবে সাধারণ মানুষকে?

বাজেটের ২৪ ঘণ্টা আগেই অমিত শাহ বাংলায় এসে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু বাজেটের পরিসংখ্যানে সেই ‘দরদ’ প্রকাশ পেল না। বিহারে চার-চারটি নতুন বিমানবন্দর আর বাংলার জন্য স্রেফ পুরনো প্রকল্পের মোড়ক। কেন্দ্রীয় সরকারের এই কৌশলী চাল বাংলার সাধারণ ভোটারদের মনে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার। আপাতত ‘বঞ্চনা’ আর ‘উন্নয়ন’— এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে বাংলার রাজনীতি সরগরম। মমতার ভাষায় যা ‘মিথ্যার জঞ্জাল’, বিরোধীদের কাছে তাই ‘ভবিষ্যতের দিশা’। তবে পরিসংখ্যান বলছে, দিল্লি থেকে গঙ্গা দিয়ে বিহারের দিকে যত জল গড়িয়েছে, বাংলার ভাগের জল সেখানে সামান্যই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-এর ভোটমুখী বাংলায় এই বাজেট উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের বারুদই বেশি জোগাল। বিহারের জন্য দিল্লির উপচে পড়া দাক্ষিণ্য আর বাংলার জন্য কেবল দীর্ঘমেয়াদি তিন প্রকল্পের নাম— এই বৈষম্যকে হাতিয়ার করেই এখন মমতা-অভিষেকরা ‘বঞ্চনা’র সুর সপ্তমে চড়াচ্ছেন। কেন্দ্রের এই শরিক-তোষণ নীতি বাংলার সাধারণ মানুষের মনে প্রত্যাশার বদলে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে ‘মিথ্যার জঞ্জাল’ বনাম ‘শিল্পের দিশা’— এই দুই বিপরীত মেরুর লড়াইয়ে বাংলার উন্নয়ন এখন দিল্লির রাজনৈতিক দাবার চালের জালে বন্দি। লোকসভার পর বিধানসভা যুদ্ধের আগেও দিল্লির ‘বিমাতৃসুলভ’ তকমা কি বিজেপি মেটাতে পারবে? উত্তর দেবে ব্যালট বাক্স। ছবি—সংগৃহিত ।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর