নয়া জামানা, কলকাতা : দাবি না মানলে এবার আরও বড়সড় আন্দোলনের পথে নামতে চলেছেন রাজ্যের আশাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য— আসন্ন কোনো বাজেটে যদি তাঁদের জন্য ইতিবাচক কোনো ঘোষণা না থাকে, তবে লড়াইয়ের ঝাঁজ বাড়বে কয়েক গুণ। শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক নাগরিক সম্মেলনে এই কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। গত ৩৯ দিন ধরে চলা কর্মবিরতি বজায় রেখেই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা মাঠ ছাড়তে নারাজ।
এদিনের নাগরিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদিকা ইসমতারা খাতুন থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার, শুভেন্দু মাইতি এবং আরজি কর আন্দোলনের পরিচিত মুখ চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো। সম্মেলনে মূলত গত ২১ জানুয়ারি বিকাশ ভবন অভিযানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে, সরকারি কর্তাদের দেওয়া সময় মেনেই ওইদিন অভিযান হয়েছিল। তা সত্ত্বেও পুলিশ অতিসক্রিয়তা দেখিয়ে কর্মীদের ওপর ‘তাণ্ডব’ চালিয়েছে। পুলিশের বাধা পেয়ে একদল কর্মী অদূরে বিক্ষোভ দেখান এবং অন্য একটি অংশ ধর্মতলায় অবস্থান করেন। বিশিষ্টজনেরা পুলিশের এই ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছেন।
আশাকর্মীদের মূল অভিযোগ বকেয়া টাকা এবং চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা নিয়ে। বর্তমানে তাঁরা মাসে মাত্র ৫ হাজার ২৫০ টাকা ভাতা পান। যা হিসেব করলে দিনে দাঁড়ায় মাত্র ১৭৫ টাকা। আন্দোলনকারীদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে ন্যূনতম বেতন ২৬ হাজার টাকা হওয়া উচিত হলেও তাঁরা আপাতত স্থায়ীভাবে ১৫ হাজার টাকা সাম্মানিকের দাবি জানাচ্ছেন। এর পাশাপাশি সরকারি অন্যান্য কর্মীদের মতো মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির দাবিও জোরালো হয়েছে। আশাকর্মীদের বক্তব্য, গত দেড় বছর ধরে তাঁদের ইনসেনটিভ এবং সার্ভের টাকা বাকি পড়ে রয়েছে। বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সুরাহা মেলেনি।
সংগঠনের রাজ্য সম্পাদিকা ইসমতারা খাতুন সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আশাকর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি, ভাগে ভাগে টাকা না-দিয়ে সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া মতো বিষয় নিয়ে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সেখানে বারবার সরকার ডেকেছে আমাদের। গত 7 জানুয়ারি, 21 জানুয়ারি ডেকেছিল আমাদের। উদ্দেশ্য ছিল সমস্যার সমাধান ও দাবি মেটানো৷ কোনোটাই তারা করেনি।’ তিনি আরও জানান যে মুখ্যমন্ত্রী বারবার ‘সবুর’ করার কথা বললেও সেই ধৈর্যের সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘21 তারিখ বিকাশ ভবন ডেকেছিল। সেখানে আসার পথে কর্মীদের উপর তাণ্ডবলীলা চালায় পুলিশ। আমাদের দাবি যতদিন পূরণ হচ্ছে, আমার আন্দোলনে আছি। কোনও ভয় অত্যাচারে ভিত নয়। আমাদের ন্যায্য দাবি অধিকার মর্যাদার সঙ্গে ছিনিয়ে আনব। আমাদের কর্মবিরতির 39 দিন চলছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন সবুর করুন হবে। অনেক দিন ধরেই প্রত্যাশা পাচ্ছি। এটার একটা সীমা আছে। আগামিদিনে ভোট ও বাজেট আছে। আমাদের এই সমস্যার সমাধান না-হলে আন্দোলন চূড়ান্ত জায়গায় যাবে। কর্মীরা রাস্তায় আছে।’
সম্মেলনে উঠে এসেছে আশাকর্মীদের দৈনন্দিন কাজের সংকটের কথা। গ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই কর্মীদের অভিযোগ, ইনসেনটিভের টাকা নিয়ে চরম অনিয়ম চলছে কয়েক বছর ধরে। টাকা চাইলে ছাঁটাই বা বেতন কাটার হুমকি দেওয়া হচ্ছে জেলা ও ব্লক স্তরে। অথচ ডিজিটাল কাজের চাপে স্মার্টফোনের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। উপযুক্ত পরিষেবার জন্য মাসে অন্তত ৩৫০ টাকার ৫-জি ডেটা প্যাকের দাবিও জানানো হয়েছে। এছাড়াও কর্মরত অবস্থায় কোনো আশাকর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার দাবিও রাখা হয়েছে সরকারের কাছে। সব মিলিয়ে, বাজেটই এখন আশাকর্মীদের কাছে শেষ লড়াইয়ের অ্যাসিড টেস্ট।