নয়া জামানা,কলকাতা : রাজনীতির অন্দরমহলে এখন একটাই প্রশ্ন— তবে কি ‘শূন্য’ থেকে ফিরতে যে কোনও হাত ধরতেও রাজি সিপিএম? নিউ টাউনের এক হোটেলে তৃণমূলত্যাগী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে মহম্মদ সেলিমের গোপন বৈঠক ঘিরে আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। বুধবার রাতের সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। তিন দশক আগে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রিত্বে বাধা দেওয়া বা পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইউপিএ-র সমর্থন প্রত্যাহার— সিপিএমের ইতিহাসে বড় সিদ্ধান্ত কম নেই। কিন্তু খোদ রাজ্য সম্পাদককে ঘিরে দলের অন্দরে এমন বিদ্রোহ সাম্প্রতিক কালে নজিরবিহীন। প্রবীণ নেতারাও কবুল করছেন, এই বৈঠক দলের নীতি-আদর্শের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অভিযোগ, তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই সেলিম এই অভিযান চালিয়েছেন। কেন একজন রাজ্য সম্পাদককে নিজে গিয়ে হুমায়ুনের মতো বিতর্কিত নেতার মন বুঝতে হল, তা নিয়ে দলের অন্দরেই আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে। সম্পাদকমণ্ডলীর এক প্রবীণ সদস্য সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কেন সম্পাদককেই যেতে হল? কেন তা নিয়ে আগে দলে আলোচনা করা গেল না? কী এমন গোপনীয়তা, যে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীকে এড়িয়ে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক করতে হল?’ তাঁর কথায়, দলের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোকে কি এখন গুরুত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছে?
সেলিম অনুগামীরা অবশ্য ছেড়ে কথা বলছেন না। তাঁদের দাবি, আধুনিক রাজনীতিতে সব কিছু ঢাকঢোল পিটিয়ে হয় না। কমিটির ‘আমলাতন্ত্র’ বজায় রাখতে চেয়ে যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা বাস্তববিমুখ। সেলিমের নিজের ব্যাখ্যা, তিনি কেবল হুমায়ুনের ‘মন’ বুঝতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। যে হুমায়ুন দেড় মাস আগে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করে তাঁর ‘লাইন’ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে হুমায়ুন গত লোকসভা ভোটের সময়ে হিন্দুদের ভাগীরথীদের ভাসিয়ে দেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছিলেন, তাঁর মন বুঝতে কেন সেলিমকে হোটেলের ঘরে ছুটতে হবে? এমনকি হুমায়ুন কবীর তো বিজেপির সমর্থন নিতেও তাঁর কোনও ‘ছুতমার্গ নেই’ বলে ঘোষণা করেছেন। এমন এক ‘সাম্প্রদায়িক’ নেতার সঙ্গে বৈঠক বামেদের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করছে বলেই মত সমালোচকদের।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাংস্কৃতিক জগত, সর্বত্রই এখন সমালোচনার ঝড়। নাট্যকার চন্দন সেনের মতো ব্যক্তিত্বরাও এই ঘটনায় সরব হয়েছেন। সিপিএমের নীচুতলার কর্মীদের প্রশ্ন, যে দলের আদর্শই মূল পুঁজি, সেখানে কি জয়ের জন্য আদর্শ জলাঞ্জলি দেওয়া হবে? দলের একটা বড় অংশ মনে করছে, এর কুপ্রভাব পড়বে উদ্বাস্তু এলাকাগুলিতে। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে হিন্দুত্ব— নানা ইস্যুতে যখন জনমত উত্তপ্ত, তখন হুমায়ুনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা হিতে বিপরীত হতে পারে। দলেরই এক নেতার কথায়, ভেনেজুয়েলার মিছিলে ২০ জন হলেও বাংলাদেশের দীপু দাস হত্যার মিছিলে ২০০ জন আসছেন। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা আত্মঘাতী হতে পারে।
সেলিম শিবিরের পাল্টাযুক্তি অবশ্য কঠোর বাস্তববাদের ওপর দাঁড়িয়ে। মালদহ-মুর্শিদাবাদে বিজেপির হাত থেকে বাঁচতে এবং ‘শূন্য’ কাটাতে গেলে সব শক্তির সঙ্গেই কথা বলতে হবে। তাঁদের মতে, ‘অত নৈতিকতা দিয়ে এখন কিছু হবে না। আগে কয়েকটা আসন জিততে হবে। সেলিম যা করেছেন, বেশ করেছেন। দরকারে আবার করবেন।’ এই তর্কের জের টানতে গিয়ে উঠে আসছে ইতিহাসও। এক পক্ষ মনে করাচ্ছে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা, যিনি হিন্দু মহাসভার নেতা হওয়া সত্ত্বেও সিপিএমের সমর্থন পেয়েছিলেন। অন্য পক্ষ পাল্টা মনে করাচ্ছে পি সুন্দরাইয়ার ইস্তফার কথা। জরুরি অবস্থার সময় জনসঙ্ঘের ঘনিষ্ঠতা সহ্য না করতে পেরে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়েছিলেন।
এই আবহে আগামী মাসের রাজ্য কমিটির বৈঠক রীতিমতো উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা। বিরোধীরা যেমন সেলিমকে কাঠগড়ায় তুলছেন, তেমনই তাঁর অনুগামীরা তৈরি করছেন পাল্টা ব্যূহ। তবে তৃণমূলের কুণাল ঘোষ ডুগডুগি বাজিয়ে বিদ্রুপ করতে ছাড়েননি। তিনি গেয়েছেন, ‘আমার এই ছোট্ট ঝু়ড়ি, এতে রাম-বাম আছে, দেখে যা নিজের চোখে, কমরেড সেলিম কেমন নাচে!’ সিপিএমের অন্দরমহলে এখন প্রশ্ন একটাই, দলের আগামী লড়াই কি নীতির পথে হবে নাকি স্রেফ আসন সংখ্যার অঙ্কে?