ব্রেকিং

বিকশিত ভারত: স্বপ্ন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

ড.মুহাম্মদ ইসমাইল সহকারী অধ্যাপক দেওয়ান আব্দুল গণি কলেজ   বিকশিত ভারত একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধন করে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার....

বিকশিত ভারত: স্বপ্ন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

ড.মুহাম্মদ ইসমাইল সহকারী অধ্যাপক দেওয়ান আব্দুল গণি কলেজ   বিকশিত ভারত একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন

ড.মুহাম্মদ ইসমাইল
সহকারী অধ্যাপক
দেওয়ান আব্দুল গণি কলেজ

 

বিকশিত ভারত একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধন করে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যাতে ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষে ভারত একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
‘বিকশিত ভারত’ ধারণাটি কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সার্বিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দর্শন, যেখানে সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সুশাসনের সমন্বয়ই মূল লক্ষ্য।
বিকশিত ভারত বলতে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, দারিদ্র্য সীমিত থাকবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সকলের জন্য সহজলভ্য হবে, প্রশাসন হবে দক্ষ ও স্বচ্ছ এবং দেশ দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকবে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের Capability Approach অনুযায়ী উন্নয়ন মানে কেবল আয়ের বৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের পছন্দ, সক্ষমতা ও স্বাধীনতার বিস্তার। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিকশিত ভারত এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার সম্ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিকশিত ভারত মানে শক্তিশালী শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, উন্নত রাস্তাঘাট ও অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা। একইসঙ্গে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও সুশাসন এই ধারণার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে বর্তমান ভারতের বাস্তব চিত্র এই স্বপ্নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একদিকে ‘বিকশিত ভারত’-এর ঘোষণা, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণে দুর্নীতি, পক্ষপাতমূলক আচরণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা ক্রমবর্ধমান সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য। একদিকে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে অগাধ সম্পদের পাহাড়, অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য ও অনাহারের সঙ্গে লড়াই করছে।
যদিও সাম্প্রতিক দশকে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে এখনও একটি বড় অংশের মানুষ ন্যূনতম দুবেলা পেটভরা খাবার নিশ্চিত করতে পারছে না। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে এবং দেশের মোট সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার প্রায় ৯০ শতাংশ ভোগ করছে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ। আজও অপুষ্টিজনিত রোগে অসংখ্য শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং অকালে মৃত্যুবরণ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে কুজনেটস কার্ভ তত্ত্ব কিছুটা আশার আলো দেখালেও বাস্তবতা উদ্বেগজনক। Kuznets Curve Theory অনুযায়ী উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়—ভারতে যার প্রতিফলন স্পষ্ট। কিছু শহর ও রাজ্য দ্রুত উন্নতি করলেও গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে দারিদ্র্য আজও প্রকট। এই বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং উন্নয়নের সুফল সীমিত করে দেয়। অর্থাৎ উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা অনেক সময় বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই এগোয়—বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে সে কথাই যেন সত্য বলে মনে হয়।
বিকশিত ভারতের পথে আরেকটি বড় বাধা হলো বেকারত্ব ও দক্ষতার অভাব। বর্তমানে প্রায় সব রাজ্যেই বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। শিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যেই জীবিকা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ কর্মক্ষম হলেও তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। Human Capital Theory অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি, অথচ বাস্তবে শিক্ষিত যুবসমাজের একটি বড় অংশ বেকার বা অর্ধ-বেকার। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পখাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি। বহু শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা বিকশিত ভারতের স্বপ্নকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা আজও সহজলভ্য নয়। গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় হাসপাতাল, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অভাবে মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হচ্ছে। অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থনীতিকে গতিশীল করে—এ কথা সত্য। শহরাঞ্চলে রাস্তাঘাট, রেল, মেট্রো ও ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নতি হলেও দেশের বহু গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল পরিষেবার ঘাটতি রয়ে গেছে। এই আঞ্চলিক বৈষম্য বিকশিত ভারতের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্পদ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারায় ভারত আজ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। পাশাপাশি সুশাসনের অভাব উন্নয়নকে আরও মন্থর করে তুলছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়, অথচ দুর্নীতি কেন্দ্র থেকে রাজ্য—সর্বত্রই গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে বহু উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
ডিজিটাল ব্যবস্থা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হলেও দেশে স্পষ্ট ডিজিটাল বৈষম্য বিদ্যমান। গ্রাম ও শহরের মধ্যে প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি পরিষেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বাধা সামাজিক বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির অভাব। বিভাজনের রাজনীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুকরণ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। প্রশাসনিক নীরবতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। Inclusive Growth Theory অনুযায়ী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত না করলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত ও নারীদের মানবিক নিরাপত্তা ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও নিম্ন আয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
তবুও ভারতের সামনে সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বিপুল তরুণ জনসংখ্যা ও তাদের মেধাকে কাজে লাগানো গেলে, দ্রুত ডিজিটালাইজেশন, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশ দেশকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। প্রয়োজন সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সুসমন্বিত নীতি প্রণয়ন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিকশিত ভারত কেবল একটি সরকারি লক্ষ্য নয়—এটি একটি জাতীয় স্বপ্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানব উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, সুশাসন ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাই এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি ও সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি সত্যিকারের বিকশিত ভারত গড়ে তোলা সম্ভব।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর