মালদার নীলিমা-নকুল-নাইমা-সেজুতির সোনালি কাহিনি
তনয় কুমার মিশ্র
মানুষের জীবনে বয়স,অভাব, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাধা-এ সবই সাফল্যের পথে কখনোই শেষ কথার নয়।সে কথাই যেন নতুন করে প্রমাণ করে চলেছে মালদা জেলার চার অনন্য ক্রীড়াবিদ-৬৫ বছরের নীলিমা ঘোষ, ৮৪ বছরের নকুলচন্দ্র চৌধুরী, দারিদ্র্য জয়ের প্রতীক নাইমা খাতুন এবং বিস্ময়-শিশু সেজুতি বারুই।চারজনের গল্প আলাদা, সংগ্রাম আলাদা কিন্তু লক্ষ্য একটাই…জয়ে নিজের, পরিবারের, জেলার এবং দেশের গর্ব বাড়ানো।
মালদার থেকে ভেসে আসা এই ক্রীড়াসফলতার ঢেউ আজ গোটা রাজ্য ও দেশকে অনুপ্রাণিত করছে। একদিকে পড়ন্ত বয়সেও তারুণ্যের বজ্রগতি, অন্যদিকে দারিদ্র্যের ঘোর অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে দৌড়-মালদার মাটি যেন নতুন করে প্রমাণ করেছে,খেলা শুধু শরীরচর্চা নয়, খেলা চরিত্র গড়ে।
চলুন একে একে পরিচয় করি মালদার এই চার অনন্য রত্নের সঙ্গে-

নীলিমা ঘোষ: ৬৫-তেও তারুণ্যের ঝলক-এশিয়ান মাস্টার্সে দুই পদক জয়
৬৫ বছর বয়সে যেখানে অনেকে ধরে নেন হাঁটাচলাও কমে যায় সেখানে মালদার কালিতলার বাসিন্দা নীলিমা ঘোষ যেন রীতিমতো ব্যতিক্রমের জীবন্ত প্রতীক। বয়স তাঁর কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটা সংখ্যা বাস্তব জীবনে তিনি এখনও ঝলসে ওঠা তরুণ অ্যাথলিট।
চেন্নাইয়ের জহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে আয়োজিত ২৩তম এশিয়ান মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে এনে দিলেন দু’দুটি মূল্যবান পদক
৮০ মিটার হার্ডলসে ব্রোঞ্জ
হাই জাম্পে সিলভার
মালদার ক্রীড়ামহলে যেন উৎসব লেগে গেল তাঁর এই অর্জনে। তরুণ ক্রীড়াবিদদের কাছে তিনি আজ অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
নীলিমার সাফল্যের ছক
নীলিমা ঘোষ ছোট থেকেই খেলাধুলায় পারদর্শী। খেলাধুলাই তাঁকে পৌঁছে দেয় শিক্ষকতার পেশায়। মকদমপুর হাইস্কুলে দীর্ঘদিন ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ২০২০ সালে অবসর নেন।
কিন্তু অবসরের পরও থামেননি। এখনও প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা করেন। বয়স বাড়ছে, অথচ দৌড়, জাম্প, হার্ডলস—সব জায়গাতেই সমান দক্ষ।
এর আগেও তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য এনে দিয়েছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ৩৮তম শ্রীলঙ্কা মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে এনে দেন চারটি পদক। তাই তাঁর নতুন সাফল্য যেন মালদার গর্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল।
নীলিমা বলেন,খেলা আমার জীবন। শরীরকে ঠিক রাখতেই হবে-এই শৃঙ্খলাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

নকুলচন্দ্র চৌধুরী: ৮৪-তেও বজ্রগতির পা-১৫০০ মিটারে ব্রোঞ্জ
৮৪ বছর বয়সেও ১৫০০ মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জ পদক।
এই কথা শুনে কেউ বিশ্বাস না করলেও ঘটনাটি একেবারে সত্যি মালদার ফুলবাড়ি সংলগ্ন মনস্কামনা রোডের বাসিন্দা নকুলচন্দ্র চৌধুরীর অসাধারণ অর্জন।
চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৩তম এশিয়া মাস্টার্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫০০ মিটার দৌড়ে তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করে ভারতের হাতে তুলে দেন ব্রোঞ্জ পদক।এ যেন শুধু পদক নয়—বয়সকে হারানোর অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক।
দারিদ্র্য ভেদ করে দৌড়
শৈশবে নকুলের জীবনে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবার সঙ্গে খেজুরের রস বিক্রি করতে হতো। তবুও দৌড় ছিল তাঁর নেশা। স্কুল-কলেজে ১০০, ৪০০, ৮০০ মিটারে ছিলেন অপরাজেয়।
পরে কেন্দ্রীয় আবগারি দফতরে চাকরি পান এবং সুপারিনটেনডেন্ট হয়ে ২০০২ সালে অবসর নেন।
অবসরের পরেও দৌড় থামেনি। আজও রোজ সকালে তাঁকে মাঠে দেখা যায়।
২০২৪ সালের মধ্যেই বিভিন্ন জাতীয় ও রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় তিনি বহু পদক জিতে নিয়েছেন-হিমাচল, বেঙ্গালুরু, তামিলনাড়ু—সব জায়গা তাঁর পরিচিত দৌড়পথ।
নকুলবাবু বলেন,মন যদি তরুণ থাকে বয়স কিছুই করতে পারে না। শরীরকে ঠিক রাখা মানেই জীবনকে জয়ের পথে নিয়ে যাওয়া।

নাইমা খাতুন: দারিদ্র্য জয় করে এশিয়াডে স্বর্ণ-মালদার গর্ব এই সিভিক পুলিশ কর্মী
মালদার মানিকচকের রাজনগর গ্রামের সাধারণ পরিবারে জন্ম নাইমা খাতুনের। সংসারে দারিদ্র্য ছিল ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। কিন্তু সেই দারিদ্র্যই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং সাফল্যের পথ দেখিয়েছে।
জ্যাভলিন থ্রো-এর অনূর্ধ্ব-৩৫ বিভাগে এশিয়াড গেমসে সোনা জিতে নিয়ে মালদাকে তুলে এনেছেন দেশের গর্বের আসনে।
সংগ্রাম ছিল পথের প্রতিটি ধাপে
ছোটবেলায় নাইমাকে প্রথম প্রশিক্ষণ দেন কালিন্দ্রীর শিক্ষক বাবলু পাঠক। পরে কোচ পুলক ঝার কাছে আরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেন।সংসারের দারিদ্র্যের কারণে মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সিভিক পুলিশের চাকরি নিতে হয়। কিন্তু তাতেও থামেনি তাঁর খেলার প্রতি ভালোবাসা।
বন্ধুর পরামর্শে আবার মাঠে ফেরেন। মালদা ভেটারনার্স ক্লাব তাকে নতুন করে সুযোগ দেয়। রাজ্য-জাতীয় সব প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করে জায়গা করে নেন এশিয়াডে।
টাকা না থাকায় এশিয়াডে অংশ নেওয়াই প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। মালদা জেলা পুলিশ সুপার ও মানিকচক থানার আইসি তাঁর পাশে দাঁড়ান। তাঁদের সাহায্যেই নাইমা ছুটে যান বেঙ্গালুরুতে।
সেখানে নিজের জীবনের অন্যতম সেরা পারফর্ম্যান্স দিয়ে জ্যাভলিনে সোনা জিতে নেন।
নাইমা বলেন,এই পুরস্কার ভেটারনার্স ক্লাব, আমার কোচ আর মালদা পুলিশের। ওদের সাহায্য না পেলে আমি আজ এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।
সেজুতি বারুই:মালদার বিস্ময়-বালিকা-তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী এবার সাউথ এশিয়ান যোগা গেমসে
বয়স মাত্র ৮-৯ বছর। অভাব-অনটনের সংসার। বাবা সবজি বিক্রেতা, মা গৃহিণী। সেই ছোট্ট মেয়েই আজ মালদার মুখ উজ্জ্বল করছে গোটা এশিয়া স্তরে।
মালদার মহানন্দা কলোনির বাসিন্দা ও নিত্যানন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সেজুতি বারুই এবার সাউথ এশিয়ান যোগা চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবে।
এ যেন মালদার জন্য এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
কীভাবে উজ্জ্বল হল সেজুতির পথ ?
দারিদ্র্যের মধ্যেই প্রতিদিন নিয়ম করে যোগা অনুশীলন করত সেজুতি।সম্প্রতি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অনুষ্ঠিত জাতীয় যোগা প্রতিযোগিতায় ৮–১০টি রাজ্যের ২৫ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে স্থান পায় সাউথ এশিয়ান দলে।
২৯ ডিসেম্বর নেপালের কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত হবে এই গেমস।
ডিপিএসসি-র পক্ষ থেকে তাকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যান বাসন্তী বর্মন বলেন—
সেজুতি শুধু মালদার নয়,আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গর্ব।
সেজুতির বাবা আবেগের সঙ্গে বলেন,আমরা গরিব, কিন্তু মেয়েটা ছোট থেকে খুব পরিশ্রম করে। কোচ পাপ্পু আর স্কুলের শিক্ষকরা তাকে যেভাবে সাহায্য করেছেন তা আমরা কোনোদিন ভুলব না।
মালদার ক্রীড়ায় নতুন ভোর-চার তারকার আলোয় উজ্জ্বল জেলার আকাশ
নীলিমা, নকুল, নাইমা ও সেজুতি-চারজন চার রঙে রাঙাল মালদাকে।
* কেউ বার্ধক্যকে হারিয়েছে
* কেউ দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলেছে
* কেউ জীবনের আট দশক পেরিয়েও দৌড়ে শিখরে উঠেছে
* কেউ আবার শিশুমন নিয়ে জয় করেছে জাতীয় মঞ্চ—
তাদের গল্পে আছে সংগ্রাম, পরিশ্রম, অসম্ভব ইচ্ছে, আর অদম্য জেদ।
আজ মালদা জেলার ক্রীড়ামহল গর্বে শিহরিত।ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে এঁরা অনুপ্রেরণা-
চেষ্টা থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়।
মালদার চার রত্ন শেখাল-স্বপ্ন কখনো বয়স দেখে না
নীলিমা শেখালেন-বয়স থামাতে পারে না প্রতিভাকে।নকুল বললেন-মনকে তরুণ রাখলে জীবনও তরুণ থাকে।
নাইমা প্রমাণ করলেন—দারিদ্র্য নয়, মনোবলই মানুষের পরিচয়।
সেজুতি দেখাল—স্বপ্নকে যদি ছোটদেরও সুযোগ দেওয়া যায়, তারা আকাশ ছুঁতে পারে।
মালদার এই চার তারকার সাফল্য শুধু পদক নয়—
এ এক জীবনদর্শন,যা গোটা দেশকে নতুন করে ভাবায় |
খেলাধুলা শুধু খেলাই নয়-এ জীবন জয়ের পথ।