
নির্মল কুমার সিংহ
শিক্ষক
নয়া জামানা
পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষে সবথেকে চর্চিত বিষয় হলো উন্নয়ন। কোথাও উন্নয়ন মানে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া! আবার কোথাও উন্নয়ন মানে চাকরি পাওয়া-রাস্তা তৈরি করা-বড় বড় বিল্ডিং,অট্টালিকা, সেতু তৈরি করা প্রভৃতি! বাস্তবে কি উন্নয়ন মানে সেগুলো? বাস্তবেই কি আমরা উন্নয়নের আসল চিন্তায় পৌঁছাতে পেরেছি? সত্যি কি অর্থ প্রচুর আয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন সম্ভব? যারা প্রচুর পরিমাণে অর্থ বেআইনিভাবে উপার্জন করছে, তাহলে কি উন্নয়ন তাদের হয়ে গেছে?
চলুন আধুনিক অর্থনীতি এবং আধুনিক চিন্তা কি বলছে একটু দেখে নেওয়া যাক। বর্তমান বিশ্বে তিন ধরনের অর্থনীতির দেশ দেখতে পাওয়া যায়। এগুলি হল উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, এবং অনুন্নত দেশ। এই দেশগুলির সার্বিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করার ক্ষেত্রে মাল্টি ডাইমেনশনাল ইনডেক্স ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মাল্টি ডাইমেনশনাল ইনডেক্স অনুযায়ী, প্রতিটি দেশের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিষেবা-জন্মহার নিয়ন্ত্রণ-মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণ-খাদ্য সুরক্ষা-স্যানিটাইজেশন-নারী পুরুষ অনুপাত-প্রযুক্তি ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়কে দেখা হয়। আজকে নরওয়েকে আমরা যদি উন্নত দেশ বলে থাকি, তাহলে সেই দেশের উপরোক্ত বিষয়ের অবস্থা সার্বিকভাবে অনেক ভালো। আবার নাইজেরিয়াকে আমরা অনুন্নত দেশ বলে থাকি, তাহলে সেই দেশের উপরোক্ত বিষয়ের অবস্থা সার্বিকভাবে খুব একটা ভালো নয়। আবার ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের কথা যদি বলে থাকি, সে ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়ের অবস্থা সার্বিকভাবে ভালো খারাপের মধ্যে রয়েছে। মূলত এই মাল্টি ডাইমেনশনাল ইনডেক্সের উপর ভিত্তি করে মানব উন্নয়ন সূচক, বিশ্ব খুদা সূচক, লিঙ্গ বৈষম্য সূচক প্রভৃতি তৈরি করা হয়ে থাকে। এই সূচক গুলিতে নরওয়ে-অস্ট্রেলিয়া-জাপান প্রভৃতি দেশগুলো যথেষ্ট ভালো ফল করেছে। আবার ভারত-চীন-ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশগুলির ফল খুব একটা ভালো নয়। ভারত মানব উন্নয়ন সূচকে র্যাঙ্ক ১৩২ (০.৬৩৩), বিশ্ব ক্ষুধার্ত সূচকে রাঙ্ক ১১১ (যেখানে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো আমাদের থেকে এগিয়ে রয়েছে)। অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন তথ্য ভারতের জন্য সঠিক দেখাচ্ছেনা।
এবার আসি পশ্চিমবঙ্গের কথায়; স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আর্থিক দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে সার্বিক উন্নয়ন দেখা যায়, বামপন্থী সরকার আসার পর থেকে সেই উন্নয়ন সার্বিকভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভূমি সংস্কার, শ্রেণী সাম্য প্রভৃতি পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকার আসার পর অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। হয়তো আমাদের দেশ সার্বিক উন্নয়ন করে এই ইনক্লুসিভ অবস্থা তৈরি করার জন্যই। তাই দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের মতো জায়গাতে মানুষের আয়ের বৈষম্য অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কম। এই রাজ্যে যেমন প্রচুর ধনী শালী শিল্পপতি তেমন দেখা যায় না, তেমন প্রচন্ড গরিব পিছিয়ে পড়া মানুষও দেখতে পাওয়া যায় না। সমস্যা হল, এই অবস্থা অর্থনীতির পরবর্তী অবস্থাকে হযবরল করে তোলে। এই হযবরল অবস্থা সঠিক করার জন্য শিক্ষার মান বা মেরুদন্ড শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই সময় যে সরকার আসে, সে সরকারকে সার্বিকভাবে পরিষেবার উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়ার ভীষণভাবে জরুরী। বিশেষ করে শিক্ষা-স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো। এই সময় আমাদের রাজ্যে সিঙ্গুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আসে। এই সরকার এসে যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো প্রভৃতি বিষয় বিশেষভাবে নজর না দেওয়াই যে হারে আমাদের রাজ্যের অর্থনীতির অগ্রগতি হওয়া প্রয়োজন তেমন হলো না। আরো মানুষের মধ্যে শ্রেণী বৈষম্য তৈরি হলো। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি কেমন যেন একটা খাপছাড়া অবস্থায় এখন রয়েছে। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, পশ্চিমবঙ্গে এখন ভীষণভাবে যেটা প্রয়োজন, সেটা হল শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামোতে জোর দেওয়া। নিশ্চয়ই বর্তমান সরকার সে বিষয়টিকে লক্ষ্য করছে। বামপন্থী সরকারের সমস্যা হল, তারা ৩৪ বছর রাজত্ব করার পরেও যে ইনক্লুসিভ ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গে তৈরি করার চেষ্টা করেছিল, সেটা আকার দিতে পারেনি(কেরালা অনেক ক্ষেত্রেই পেড়েছে)। ফলে মানুষের মধ্যে উন্নয়ন বিষয়টি নিয়ে এক দ্বিধা তৈরি হয়। কেউ মনে করে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি করাকেই উন্নয়ন বলবো, আবার কেউ বলে আমার ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জন করাটাই উন্নয়ন; অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা যাই হোক না কেন। তাই এক শ্রেণীর মানুষ অসাধু উপায়ে উপার্জন করছে। তাই পশ্চিমবঙ্গে এখন শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নত থেকে উন্নত ডিগ্রী বা গবেষণার আগ্রহ দেখা যাচ্ছেনা। দেখা যাচ্ছে পঞ্চায়েত গুলিতে ভোটে দাঁড়ানোর আগ্রহ। এলাকায় এলাকায় শিক্ষিত মানুষের সেই সম্মান নেই। আমি বলতে চাইছি, আজকে পশ্চিমবঙ্গের সমাজব্যবস্থার সমস্যা তৈরির জন্য বামপন্থী সরকারও অনেকটাই দায়ী। কারণ যে কোন সরকারের নীতি পরবর্তী প্রজন্মের উপর সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ বর্তমান মমতা সরকারের নীতি ভালো বা খারাপ তার প্রভাব পরবর্তীতে ভালো করেই পড়বে।
তাহলে এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কিছু করণীয় কি আছে ? একদম আছে। বাস্তবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার গুলির তেমন কিছু করার থাকেনা। ভারতবর্ষের সংবিধানের এক নম্বর ধারায় ভারতকে ইউনিয়ন অফ স্টেটস বলা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রের সার্বিক চিন্তা দেশ তথা রাজ্যের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। তবে রাজ্য সরকার ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে পারে। আমি আগেই বলেছি, বর্তমানে রাজ্য সরকারকে শিক্ষা স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো এই তিনটি বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিত। উচ্চশিক্ষাকে আরো বেশি পরিমাণে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই দিকে নজর দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরো কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই দিকে নজর দেওয়া উচিত। বুনিয়াদি শিক্ষাকে আরো বেশি শক্তিশালী করে পরিযায়ী শ্রমিক পরবর্তী ক্ষেত্রে যতটা কম তৈরি হয় সেই বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। সর্বোপরি, স্কুল কলেজগুলিতে যারা পড়াশোনা করছে তাদের পড়াশুনার মানদণ্ড কিভাবে বাড়ানো যায় সেই বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। আমরা ভারতবর্ষে অন্যান্য রাজ্য থেকে উন্নয়নের নিরিখে এক স্তর এগিয়ে রয়েছি। বর্তমান রাজ্য সরকারকে সেই বিষয়টিকে মান্যতা দিয়ে পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরো সুদৃঢ় করায় শ্রেয়। রাজ্য সরকার নিজেও জানে পরিষেবা থেকে রাজ্যের আয় সব থেকে বেশি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার জিএসটি থেকে প্রচুর পরিমাণে আয় করে। তাই পরিষেবা কে উন্নত করতে পারলে আদলে রাজ্যেরই উন্নতি হবে এবং আরো বেশি পরিমাণে কর আদায় করতে পারবে। ফলে রাজ্যের অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ আস্তে আস্তে কমবে এবং উন্নতির ভিত্তি অনেক বেশি শক্ত হবে।
এদেশের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। রাষ্ট্রবাদী চিন্তার আদলে আর্থিক উন্নতি খুব একটা শক্তিশালী চিন্তার মাধ্যমে এগোচ্ছে না। আমরা এই কারণে এগিয়ে আছি এই নয় যে, আমরা এগোচ্ছি; আমরা এগিয়ে রয়েছি কারণ প্রতিযোগিতায় থাকা অন্যান্য দেশগুলো করোনা মহামারীর ঘটনার পর থেকে অনেকটা পিছিয়ে গেছে। তাই কেন্দ্র সরকারকেও ফিসকাল ডেফিসিট বিষয়টিকে আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। মিশ্র অর্থনীতির যে সুফল রয়েছে, সেটি সুনিশ্চিত করা উচিত। নিশ্চয়ই বর্তমান সরকার সেই বিষয়গুলিকে সুনিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বা করবে।
যাইহোক, যেকোনো রাষ্ট্র বা রাজ্যের উন্নতি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির দ্বারাই সম্ভব ( অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় (NNP FC)। তবে মাথাপিছু আয় দুর্নীতি বা অসৎ উপায়ে অর্জনের মাধ্যমে তৈরি হয় না, বাস্তবে সেটি রাষ্ট্র বা রাজ্যের জন্যই ক্ষতি।
আমাদের উন্নতি করতে হলে, দেশের মধ্যে সার্বিক চিন্তা নিয়ে আসতে হবে। আজকের দিনে ভারতবর্ষের বেশ কয়েকটি বড় সমস্যার মধ্যে একটি সমস্যা হল দুর্নীতি। কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়কেই উক্ত বিষয়ে শক্তি দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্য বলব, আপনারা যারা অসৎ উপায়ে উপার্জন করছেন এবং ভাবছেন নিজের এবং পরিবারের উন্নতি করে ফেলেছেন, বাস্তবে সেটা নয়। সেজন্য দেখা যায় অসৎ উপায়ে যারা আয় করে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ক্যারিয়ার হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম; কারণ তারা পড়াশোনার ঊর্ধ্বে অর্থ ভাবে। অসৎ উপার্জন দেশের আর্থিক ক্যালকুলেশনের সাথে যুক্ত হয় না। অর্থাৎ আপনার উপার্জন রাষ্ট্র তথা রাজ্যের জন্য মঙ্গলকর নয়। কষ্ট করে উপার্জন করুন, নিজের পরিবারের ছেলেমেয়েদের মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করুন, দেখবেন আপনার পরিবারও উন্নতি হবে তার সাথে সাথে রাজ্য তথা রাষ্ট্রেরও উন্নতি হবে। সরকারের উচিত সাধারণ পরিষেবার সাথে সাথে পরিকাঠামোর দিকে নজর দেওয়া। ভারত বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আমাদের দেশের নিজস্ব অর্থ, উৎপাদন এবং বিদেশি অর্থ কোনটির অভাব নেই।
এখন শুধু এই অর্থগুলোকে সৎ উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হলো রাষ্ট্রের কাজ। সেটি সরাসরি একাউন্টে নয়, সেটি উৎপাদনমূলক কাজ করার মাধ্যম দিয়ে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই দুটো বিষয়ের উপরে ভীষণভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে মানুষের চিন্তাধারা সঠিক হয়, শিক্ষা ঠিক থাকলে রাষ্ট্রের মেরুদন্ড তৈরি হয়।
তাই উন্নয়নের বর্তমান সংজ্ঞা হলো, মানবসম্পদ তৈরি করা এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যম দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য বা রাষ্ট্র তৈরি করা। প্রতিটা পরিবারের উচিত বাড়ির পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যকে কিভাবে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শিক্ষক আর্কিটেকচার-চ্যাটার একাউন্টেন্ট- নার্স-উকিল-বিচারপতি প্রভৃতি তৈরি করব। যদি প্রতিযোগিতা করার ইচ্ছাই থাকে তাহলে এই বিষয়ে করুন।