সুপর্ণা ভট্টাচার্য
নয়া জামানা
রনজয় আর মিতুলের আজ দশ বছরের দাম্পত্য জীবন পূর্ণতার দিন। অর্থাৎ আজ রনজয় আর মিতুলের বিবাহ বার্ষিকী । সকাল থেকেই বাড়িতে সাজো সাজো রব। রণজয় আগেই বলে দিয়েছিল এই দিনটা বেশ ঘটা করে পালন করতে চায় সে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব সবাইকে নিমন্ত্রণ করবে। মিতুল অবশ্য তাতে কোন আপত্তি করেনি। আপত্তি করার কথা নয়। কারণ রনজয় চেয়েছে যখন তখন তো সেটা হবেই। সেই কথা মত সকাল থেকে চলছে বাড়ি সাজানোর পালা। এবছর রনজয় প্রমোশন পাওয়ার পরেই বাড়ি তিনতলা কমপ্লিট করল, সঙ্গে গাড়িও কিনেছে। বাড়িটা সাজিয়েছে দেখার মত। বিকেল হতেই পার্লার থেকে লোক চলে এসেছে মিতুলকে সাজাতে।
রনজয় আগেই বলে দিয়েছিল মিতুল যেন আজ দারুন সাজে। তাকে দেখে যেন সবার তাক লেগে যায়। দশ বছরের বিবাহ বার্ষিকী বলে কথা! রণজয় মিতুলকে দামি শাড়ি গয়না সব কিনে দিয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে মিতুলকে , তবু কোথায় যেন একটা কমতি আছে মিতুলের মুখে। রনজয় সকাল থেকে বেশ কয়েকবার বলেই দিয়েছে মিতুলকে ‘আমাদের এই আজকের দিনটা উদযাপন সবাই মনে রাখবে। সবাই দেখে হতবাক হয়ে যাবে ।’ আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধব মিতুলের গয়না বাড়ি গাড়ি দেখে তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আপ্যায়ন আতিথেয়তায় মিতুল কোন খামতি রাখেনি। বরং সব সময় খেয়াল রেখেছে যাতে অতিথিদের কোন অসুবিধা না হয়। নিমন্ত্রিত অতিথিদের বাড়ি ঘুরিয়ে দেখিয়ে, নিজের সবকিছু জাহির করে রণজয় যেন আজ পরম তৃপ্তি লাভ করল। অনেক দিনের বাসনা পূর্ণতা পেল। মিতুলের দিকে নজর দেওয়ার থেকে বরং সে নিজেকে জাহির করতেই বেশি ব্যস্ত হয়েছিল আজ সারাদিন। ঠিক কটা কথা বলেছে মিতুলের সঙ্গে আজ সেটা মিতুল মনেও করতে পারে না। নিমন্ত্রিত অতিথিরা বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর রনজয় ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে মোবাইল নিয়ে শুয়ে পড়ে। মিতুলের সাথে একটা কথাও বলে না । মিতুল অবশ্য এই ধরনের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এতদিনে। মিতুল জানে রনজয় শুধুমাত্র নিজের বাড়ি গাড়ি লোককে দেখানোর জন্যই এত বড় আয়োজন করেছে। বিবাহ বার্ষিকী পালন তো একটা অজুহাত মাত্র। দশ বছরে কোনদিনই রণজয় মিতুল কে কোন গুরুত্ব দেয়নি ।
ঘরের কোনে পড়ে থেকেছে সাজানো পুতুলের মত। এই বাড়িতে তার কোন অধিকার নেই। রনজয় তো তার সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলে না। মিতুল গুমড়ে গুমড়ে মরে রোজ , একটু একটু করে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুক্তি কামনা করে। সে যে এই সংসার ছেড়ে চলে যাবে এমন পরিস্থিতিও তার নেই। কোথায় যাবে সে ? তার যাওয়ার যে কোনো জায়গা নেই। ছোটবেলা থেকে মামার বাড়ি তে মানুষ। এক অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে এই সংসারে টিকে আছে। বাইরে থেকে তার বৈভব দেখে সবাই ভাবে মিতুল খুব সুখে আছে। কিন্তু একমাত্র সে জানে তার ভেতরে পাহাড় প্রমাণ যন্ত্রণা জমা হচ্ছে রোজ রোজ। রাতের রণজয় ঘুমিয়ে পড়ার পর মিতুল ব্যালকনিতে গেল। ঘন কালো অন্ধকার তাকে যেন ঘিরে ধরল। সহ্য যন্ত্রণা যেন তাকে ক্রমশ গ্রাস করতে থাকলো। মাথার মধ্যে কত কিছু জানো জাল বুনতে থাকলো । মিতুল কে দেখে বোঝার উপায় নেই ওর মনের মধ্যে কি চলছে । একা একা যেন নিজের অদৃষ্টের সঙ্গেই কথা বলে চলেছে সে। একাকীত্ব যখন গ্রাস করে তখন হয়তো ঠিক এমনটাই হয় । পায়ে পায়ে ঘরে ফিরে আসলো সে। রনজয়ের সামনে গিয়ে দেখলো কি অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে রনজয় ঘুমাচ্ছে । আস্তে আস্তে করে আলমারি থেকে রণজয়ের দেওয়া সব গয়না বের করে পড়ে নিল সে। তারপর গিফট থেকে পাওয়া একটা শাড়ি নিয়ে সে চলে গেল পাশের ঘরে। তেরো দিন পর রনজয় আবার বহু লোক নিমন্ত্রণ করে বড় আয়োজন করে মিতুলের কাজ সম্পন্ন করল। সে ছিল এলাহী আয়োজন।
সবাই এসে রান্নার প্রশংসা করল, আয়োজনের প্রশংসা করলো , শুধু আড়ালে থেকে গেল মিতুল। মিতুলের কথা কেউ কিছুই বলল না। একটা তরতাজা প্রাণ সবার অলক্ষে হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল চূড়ান্ত অতৃপ্তি নিয়ে। মিতুল হারিয়ে গেল পাহাড় প্রমাণ যন্ত্রণা নিয়ে। নিমন্ত্রিতরা বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় রনজয় কে আবার দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য সুপরামর্শ দিতে কেউ ভোলেনি। বরং তারা জানিয়েগেছে তাদের হাতে সুপাত্রী আছে। এমন বড়লোক পাত্র কি আর সহজে পাওয়া যায়! এভাবে কত মিতুল রোজ হারিয়ে যায়। সবাই অর্থের লোভী হয় না কেউ কেউ ভালোবাসার কাঙ্গালও হয় । বাড়ি, গাড়ি, গয়না, শাড়ি, বৈভব, বিদেশ ভ্রমণ এগুলো সব মেয়েকে সুখ এনে দিতে পারে না। সম্পর্কে বোঝাপড়া থাকাটা জরুরী । না হলে একাকিত্বে ভুগতে ভুগতে কেউ হারিয়ে যায় কেউ অন্য পথ বেছে নেয়।