টিনা প্রামানিক
নয়া জামানা,মালদহ
মালদহ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েত।এক সময়ে যাকে ঘিরে ছিল যোগাযোগের সমস্যা, অপর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, জল-নিকাশির সমস্যা ও নানা সামাজিক সংকট। কিন্তু গত কয়েক বছরে বদলে গেছে এই গ্রাম পঞ্চায়েতের চিত্র। উন্নয়নের নানা প্রকল্পে একে একে ভরিয়ে তোলা হয়েছে মানুষের আশা ও স্বপ্ন।

পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এর মধ্যে তপশিলি জাতিভুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৯,৫০০, আদিবাসী ৫,১০০ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মাত্র ১ শতাংশ।সাধারণ জাতিভুক্ত সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫,০০০। এখানে মোট বুথের সংখ্যা ৩০টি। রাজনৈতিক চিত্র ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ছিল কড়া লড়াই। শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস জয়লাভ করে ২০টি আসনে এবং বিজেপি পায় ১০টি আসন। সেই নির্বাচনের ফলেই গঠিত হয় নতুন বোর্ড। প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন তৃণমূল কংগ্রেসের সোনামনি টুডু এবং উপপ্রধান নির্বাচিত হন কবিতা মন্ডল।গ্রাম পঞ্চায়েতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁরা এলাকায় উন্নয়নের কাজে জোর দেন। উন্নয়নের চিত্র: রাস্তা, ড্রেন, লাইট ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— রাস্তা নির্মাণ: প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা ঢালাই করে দেওয়া হয়েছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থা: ৩ কিলোমিটার ড্রেন তৈরি হয়েছে,ফলে জল-নিকাশির সমস্যার সমাধান হয়েছে। লাইটের ব্যবস্থা: ১০টি নতুন লাইট বসানো হয়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকাগুলোতে। সাবমারসিবল পাম্প: প্রায় ৪০টি নতুন সাবমারসিবল বসানো হয়েছে, যাতে এলাকায় পানীয় জলের অভাব না থাকে। এছাড়াও কমিউনিটি টয়লেট তৈরি ও সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট চালু হওয়ার ফলে গ্রাম পঞ্চায়েত আজ অনেকটাই নোংরা আবর্জনা ও প্লাস্টিকমুক্ত। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েতে সাধারণ মানুষ যাতে সরকারের দেওয়া সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্পের সুবিধা পান সে দিকেও বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।

বৃদ্ধভাতা: ৫৫১ জন মানুষ এর সুবিধা পাচ্ছেন। বিধবাভাতা: ২৮৮ জন উপভোক্তা ভাতা পাচ্ছেন। বাংলার বাড়ি প্রকল্প: ৫০১ জন উপভোক্তা ইতিমধ্যেই প্রথম কিস্তির টাকা পেয়েছেন। শৌচালয় নির্মাণ: নতুন করে ৫০টি বাড়িতে শৌচালয় তৈরি হয়েছে। কৃষি ও মহিলা কল্যাণ প্রকল্প কৃষক ও মহিলাদের উন্নয়ন ছাড়া গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না।

তাই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। কৃষক বন্ধু প্রকল্প: ৪,১৩৬ জন কৃষক ভাতা পাচ্ছেন। লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্প: ৮,৫০২ জন মহিলা উপভোক্তা এর সুবিধা পাচ্ছেন। সমব্যথী প্রকল্প: ৪০১ জন মৃত পরিবারের মানুষ আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে গ্রাম পঞ্চায়েতের রাস্তাঘাট, খোলা জায়গা, বাজার অঞ্চল অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। আবর্জনা ফেলার জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা হয়েছে। প্লাস্টিকমুক্ত পরিবেশ গড়ার জন্য জনসচেতনতা কর্মসূচিও নিয়মিত চালানো হচ্ছে। মানুষের মুখে হাসি এই গ্রাম পঞ্চায়েতের উন্নয়ন নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন খুশি। তাদের মতে,আগে অনেক পাড়ায় রাস্তা ছিল কাদা-মাটির, বর্ষায় হাঁটাচলাই যেত না।এখন ঢালাই রাস্তা তৈরি হওয়ায় যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। সাবমারসিবল পাম্প বসানোর ফলে জল আনতে দূরে যেতে হয় না। প্রধান ও উপপ্রধানের বক্তব্য প্রধান সোনামনি টুডু বলেন, গত দুই বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার উন্নয়নের কাজ হয়েছে। রাস্তা, ড্রেন, সাবমারসিবল পাম্প, কমিউনিটি টয়লেট তৈরি হয়েছে।

সাধারণ মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা কাজ করেছি। উপপ্রধান কবিতা মন্ডল জানান, যেসব রাস্তায় সমস্যা বেশি ছিল, সেখানে ঢালাই রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। জল-নিকাশির সমস্যা যেসব এলাকায় ছিল, সেখানে ড্রেন তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে আমরা বাচ্চাদের জন্য পার্ক তৈরি করার পরিকল্পনা করছি। আগামী দিনের লক্ষ্য পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েত শুধু বর্তমান উন্নয়ন নিয়েই নয়, ভবিষ্যতের দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখছে। শিশুদের খেলার পার্ক, আরও উন্নত আলোর ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন এবং শিক্ষা ক্ষেত্রেও নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। সমাজের পরিবর্তনের ছবি আজকের পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েত উন্নয়নের মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজ্য সরকারের প্রকল্প,পঞ্চায়েতের সচেতনতা এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এই এলাকায় সত্যিই পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাকুয়াহাট গ্রাম পঞ্চায়েত এখন আর শুধু একটি নাম নয়, বরং উন্নয়নের জোয়ার ভাসানো এক বাস্তব ছবি। রাস্তা থেকে শুরু করে আলোর ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা থেকে মহিলাদের আর্থিক অনুদান সব ক্ষেত্রেই বদলে যাচ্ছে এই এলাকার ছবি।