ভারতের ট্র‍্যাক কুইন, পিটিঊষার অজানা গল্প

ভারতবর্ষের ক্রীড়াঙ্গনে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের জীবন সংগ্রাম, সাফল্য এবং অধ্যবসায় কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। সেই নামগুলির মধ্যে অন্যতম হলেন পি.টি. ঊষা। তাঁকে বলা হয় পায়োলির এক্সপ্রেস”বা ভারতের ট্র্যাক কুইন। ভারতের নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে তিনি পথিকৃৎ, যিনি শুধু দেশের....

ভারতের ট্র‍্যাক কুইন, পিটিঊষার অজানা গল্প

ভারতবর্ষের ক্রীড়াঙ্গনে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের জীবন সংগ্রাম, সাফল্য এবং অধ্যবসায় কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন

Picture of সুস্মিতা মজুমদার

সুস্মিতা মজুমদার

নয়া জামানা

Picture of সুস্মিতা মজুমদার

সুস্মিতা মজুমদার

নয়া জামানা

ভারতবর্ষের ক্রীড়াঙ্গনে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের জীবন সংগ্রাম, সাফল্য এবং অধ্যবসায় কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। সেই নামগুলির মধ্যে অন্যতম হলেন পি.টি. ঊষা। তাঁকে বলা হয় পায়োলির এক্সপ্রেস”বা ভারতের ট্র্যাক কুইন। ভারতের নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে তিনি পথিকৃৎ, যিনি শুধু দেশের হয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক পদকই জেতেননি, বরং ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।পি.টি. ঊষার পূর্ণ নাম পিল্লাভুল্লাকাণ্ডি থেক্কে পারাম্বিল ঊষা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২৭ জুন ১৯৬৪ সালে কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় জেলার পায়োলি নামের এক ছোট গ্রামে। পরিবার ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত। বাবা ছিলেন কৃষক, মা গৃহিণী। চারপাশে ছিল অর্থাভাব ও নানা অভাব-অনটন। কিন্তু শৈশব থেকেই ঊষা ছিলেন শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্রিয়। গ্রামের স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি প্রায়শই প্রথম হতেন।শিক্ষকরা তাঁর প্রতিভা বুঝতে পেরে তাঁকে খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন।
কৈশোরে যখন বেশিরভাগ মেয়ে গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকত, তখন ঊষা মাঠে দৌড়াতেন। কিন্তু ক্রীড়া-জীবনে এগোনোর পথ সহজ ছিল না।অর্থকষ্ট, সুযোগ-সুবিধার অভাব, সমাজের বাঁধাধরা মানসিকতা—সবই ছিল পথে কাঁটা। তবু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিবারের সমর্থনে তিনি এগিয়ে যান।১৯৭৭ সালে কেরালার ক্রীড়া নির্বাচনী শিবিরে ঊষাকে প্রথম নজরে আনেন ক্রীড়া প্রশিক্ষক ও.এম. নম্ভিয়ার। তিনি ঊষার প্রতিভা চিনতে পেরে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এই সময় থেকেই শুরু হয় তার ক্রীড়াজীবনের প্রকৃত যাত্রা।

১৯৭৯ সালে ন্যাশনাল স্কুল গেমসে অংশ নিয়ে তিনি প্রথম জাতীয় স্তরে স্বর্ণপদক অর্জন করেন।তার দৌড়ের গতি ও কৌশল দেখে সবাই মুগ্ধ হয়েছিল। এই সাফল্যের পরই তিনি দ্রুত সারা দেশের নজরে আসেন।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ১৯৮০ সালে, তিনি ভারতের হয়ে মস্কো অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন। যদিও সেখানে পদক জিততে পারেননি, তবুও এত অল্প বয়সে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি প্রমাণ করেছিল যে তিনি একদিন বড় মঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করবেন।১৯৮২ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস ছিল ঊষার জীবনের প্রথম বড় মঞ্চ। সেখানে তিনি ১০০ মিটার এবং ২০০ মিটার দৌড়ে দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করেন।

ভারতীয় দর্শকদের কাছে তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।১৯৮৩ এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ কুয়েত এই প্রতিযোগিতায় তিনি স্বর্ণপদক জিতে প্রমাণ করেন যে, তিনি শুধু এশিয়ার সেরা নন, বিশ্বমানের প্রতিদ্বন্দ্বী।১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। তিনি ৪০০ মিটার হার্ডলসে অংশ নেন। সেমিফাইনালে দারুণভাবে জিতে সবাইকে চমকে দেন। ফাইনালে দৌড়ে তিনি মাত্র এক-দশমাংশ সেকেন্ডের জন্য চতুর্থ হন। যদিও পদক জেতেননি, কিন্তু ভারতের অ্যাথলেটিক্স ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী সাফল্য।

কারণ তখন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় মহিলা অলিম্পিকে এতটা এগোতে পারেননি। এই ঘটনা তাঁকে জাতীয় আইকন বানিয়ে তোলে।১৯৮৬ এশিয়ান গেমস – সিউলে তিনি জীবনের সেরা পারফরম্যান্স করেন। এই গেমসে তিনি একাই ৪টি স্বর্ণপদক (২০০ মিটার, ৪০০ মিটার, ৪০০ মিটার হার্ডলস, ৪x৪০০ মিটার রিলে) এবং ১টি রৌপ্য পদক জেতেন। এমন সাফল্য আর কোনো ভারতীয় মহিলা অ্যাথলেট অর্জন করতে পারেননি।

পি.টি. ঊষা তার দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনে প্রায় ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পদক জিতেছেন।অর্জুন পুরস্কার (১৯৮৩),পদ্মশ্রী (১৯৮৫),এশিয়ান গেমসে ১১টি পদক,এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ২৩টি পদক,১৯৮৫ সালে স্পোর্টসউইম্যান অফ দ্য ইয়ার, ১৯৯১ সালে ঊষা বিবাহ করেন ভি. শ্রীনিবাসকে, যিনি একজন ব্যবসায়ী। তাদের এক পুত্র রয়েছে। পারিবারিক জীবন ও ক্রীড়াজীবনকে সমানতালে সামলেছেন তিনি। সংসারের পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে কখনো থামিয়ে দেননি।অবসর নেওয়ার পর তিনি তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২০০২ সালে কেরালার কোঝিকোডে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঊষা স্কুল অফ অ্যাথলেটিকস। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিভাবান কিন্তু আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।


এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু প্রতিভা উঠে এসেছে, যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে। ঊষার হাতে গড়া অনেক অ্যাথলেট ভারতের হয়ে পদক জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করছে।শুধু খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে নয়, ক্রীড়া প্রশাসনেও তিনি রেখেছেন এক অনন্য ছাপ। ২০২২ সালে তিনি নির্বাচিত হন ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মহিলা এই পদে আসীন হয়। তার নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রীড়া নতুন দিগন্তের পথে এগোচ্ছে।


ঊষার জীবন সহজ ছিল না। প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না, আর্থিক সংকট ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। সমাজের চোখে তখন মেয়েদের খেলাধুলা করা স্বাভাবিক ছিল না। অনেক বিরূপ মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু প্রতিটি বাধাই তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অতিক্রম করেছেন।লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে সামান্য ব্যবধানে পদক হাতছাড়া হওয়ার কষ্ট আজও অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বরং সেই ব্যর্থতাকেই তিনি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

পি.টি. ঊষার জীবন আমাদের শেখায়—পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়। এক সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যাথলেট হয়ে উঠেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনকেও।তিনি কেবল একজন দৌড়বিদ নন, বরং একজন অনন্য অনুপ্রেরণা। তাই আজও তাঁকে স্নেহভরে সবাই ডাকে—পায়োলির এক্সপ্রেস।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর